"রোবটিক" (ফিরোজ হাসান)
“স্যার, আপনি কি কোনো ব্যাপার নিয়ে চিন্তিত?”
রিকি
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলো না।
“স্যার, আমি যে বাক্যটি বলেছি, সেটি কি সঠিক বাক্য
হয়েছে?”
“তুমি যে বাক্যটি বলেছো সেটি অত্যন্ত সুন্দর
বাক্য হয়েছে।”
“স্বাগতম স্যার।”
“স্বাগতম নয়, বলো ধন্যবাদ স্যার।”
“ধন্যবাদ। স্যার, আপনি এখন কি ভাবছেন ?”
“কোন কিছু ভাবছিনা। আমার মেজাজটা এখন খুব গরম।”
“কিভাবে গরম হলো ? এখানেতো কোন আগুনের
ব্যাবস্থা দেখছিনা!”
“মেজাজ গরম হওয়ার জন্য আগুনের দরকার নেই, তোমার কিছু উদ্ভট
কথাবার্তা শুনলেই চলবে।”
“বুঝতে পারলামনা।”
“বোঝার দরকার নেই।”
ঘটনা
তেমন কিছু না। রিকি যার সাথে কথা বলছে সেটা ডুকার নামের অতি উন্নত একটি রোবট।
উন্নত এই কারনে যে, এই রোবটকে মানুষ বলা চলে। বিজ্ঞানীরা এখন এই ঞধর-২৬ মডেলের রোবট তৈরী করছে। তৈরীর সময় যার কপোট্রোনে কোন
তথ্য প্রেরণ করা হচ্ছেনা। একেবারে শিশুর মতো অবস্থা। এই ধরনের রোবটকে সব কিছু
শেখানো হয়। এমনকি হাসি, কান্না, কষ্টের অনুভূতিও রয়েছে। এদেরকে সবকিছু শেখানোর
দায়িত্ব রয়েছে আটজনের উপর। রিকি তাদেরই একজন। রিকি এইসব রোবটের মধ্যে থেকে ডুকার
নামের একটি রোবটকে বাসায় নিয়ে এসেছে। ডুকার বর্তমানে প্রশিক্ষণের প্রাথমিক পর্যায়ে
রয়েছে। রিকি যখন বাইরে যায় তখন ডুকারের কাজ হচ্ছে লাইব্রেরীতে বই পড়া এবং
ইন্টারনেটে বিভিন্ন তথ্য দেখা। মাঝে মাঝে সে সিনেমাও দেখে। রিকির বাসায় আরও একটি
রোবট আছে। সেটি রিকির নিজস্ব রোবট। নাম টাইসো। নির্বোধের চরম পর্যায়ের রোবট বলা চলে। টাইসোর কাজ রান্নাঘরেই
সীমাবদ্ধ। তাকে রান্নার বিশেষজ্ঞ বললেও ভুল হবেনা। রান্না ছাড়া অন্যকিছু বোঝে বলে
মনে হয়না।
আজ
রিকি বাইরে থেকে বাসায় এসে কলিংবেল টিপতেই ডুকার দরজা খুলে দিয়ে বলেছে-
“আপনার যাত্রা শুভ হোক।”
এই কথা শুনে রিকির মেজাজ চড়ে গেল। টাইসো একগ্লাস
শরবত নিয়ে এসেছে। রিকি প্রসঙ্গ পাল্টালো-
“ডুকার, তুমি আজ কি কি করেছো?”
“স্যার, আমি আজ লাইব্রেরীতে একটি অদ্ভুত বই দেখলাম।
বইটির কোন শব্দই উদ্ধার করতে পারলামনা।”
“এমন বইতো আমার লাইব্রেরীতে থাকার কথা নয়!”
“অবশ্যই আছে স্যার, আমি একশ ভাগ সঠিক কথা
বলছি।”
“ঠিক আছে, তুমি বইটি নিয়ে এসো”। ডুকার
লাইব্রেরীতে গেলো, রিকি টাইসোকে ডাকলো-
“স্যার, আপনি আমাকে ইয়াদ করেছেন?”
“টাইসো, কথার মাঝে এমন জটিল শব্দ বলা বাদ দাও।”
“স্যার, আপনি আমার উপর রাগ বর্ষণ করছেন কেন, আমার মনটা খুবই ব্যথিত
হয়েছে।”
“টাইসো, তুমি এখান থেকে যাও।”
“স্যার, আপনি আমাকে বিদায় সম্ভাষন প্রদর্শন করছেন?”
“ চষবধংব টাইসো, রান্না ঘরে যাও”। টাইসো
রান্নাঘরে চলে গেল। ডুকার লাইব্রেরী থেকে এসেছে।
“এনেছো?”
“জ্বি স্যার। এই দেখুন।”
ডুকার রিকির হাতে যে জিনিসটি দিলো, সেটি একটি সাদা খাতা।
রিকি হাসবে না কাঁদবে ঠিক বুঝতে পারছে না।
“এই তোমার অদ্ভুত বই?”
“জ্বি স্যার, আপনি বইটি খুলে দেখুন, কোন অক্ষর দেখা যাচ্ছে
না। অদৃশ্য অক্ষর দিয়ে বইটি দেখা হয়েছে। এই বইটি পড়তে হলে নিশ্চয়ই আল্ট্রা এক্সওে
চশমা লাগবে। আপনার কাছে আছে স্যার? আমি বইটি পড়ার জন্য সীমাহীন ব্যকুলতা প্রদর্শণ
করছি।”
রিকি
উঠে দাঁড়ালো, বিজ্ঞানীরা কোন দুঃখে রোবট তৈরী করে কে জানে! বাসায় আর কিছুক্ষণ থাকলে বিপদেও সমূহ সম্ভবনা আছে। রিকি
বাসা থেকে বের হলো, নীহার বাসায় যাবে। নীহার বাসায় এমন উদ্ভট ঝামেলা নেই। সে
একাই থাকে, রান্নাবান্না সে নিজেই করে। রিকি বাইভার্লারের জন্য অপেক্ষা
করছে। গাড়ীতে গেলে যানযটসহ ৪/৫ ঘন্টা লেগে যাবে।
একটি বাইভার্লার এসে থামলো। বাইভার্লারে একজন মহিলা ও একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। রিকি
বৃদ্ধলোকটির পাশে বসলো। বাইভার্লারটি চলতে শুরু করেছে, বৃদ্ধলোকটি রিকিকে বললো-
“তোমার নাম কি?”
“রিকি, রিকি রডরিগেজ। আর, আপনার নাম?”
“ডেভিড হুপার। তুমি
কোথায় যাচ্ছো?”
“ঈ নগরীতে।”
“ওখানে কে আছে তোমার? ”
“আমার এক বান্ধবী থাকে ওখানে। ওর নাম নীহা।”
“নীহা কি সোলার প্রোজেক্টে কাজ করে?”
“নাতো, ও টঈচ প্রোজেক্টে কাজ করে।”
“টহফবৎ ঈরঃু চৎড়লবপঃ”
“জ্বি।”
“এ যাবৎ মাটির নীচে কতটি নগরী তৈরী হয়েছে?”
“তিনটি। এর পরের প্রোজেক্ট হবে পানির নীচে।”
“তাই নাকি! মজার তো।
তাহলে আমরা মৎস্য কন্যার মতো মৎস্য জাতি হয়ে যাবো, হাঃ হাঃ হাঃ। তুমি কি
কর।”
“মহাকাশে নতুন আবাসস্থল খোঁজার জন্য যে দলটি
যাবে,
আমি তাদেও
প্রশিক্ষক। বর্তমানে রোবটদের একটি দায়িত্বে আছি।
”
“ঈ নগরী মনেহয় এসে গেছে।”
রিকি বাইর্ভালার থেকে নামলো। নীহা উদাসভাবে
দরজায় দাড়িঁয়ে আছে। নিশ্চয়ই কোন ব্যাপর নিয়ে চিন্তিত।
“কি হয়েছে নীহা?”
“নাহ্, কিছু হয়নিতো!”
“অবশ্যই হয়েছে। তোমার চেহারা বলছে তুমি কিছু
একটা নিয়ে খুব দুঃচিন্তা করছো। আমি রোবট নিয়ে কাজ করি, কিন্তু আমি নিজে রোবট
না। প্লিজ বলো, কি হয়েছে?”
“আমি প্রেগনেন্ট।”
“এই জন্য মন খারাপ?”
“মন খারাপ না, কিন্তু... ... ”
“কিন্তু কি নীহা... বলো...”
“কিন্তু আমাকে তো এখনও সন্তান ধারণ করার
লাইসেন্স দেয়নি।”
“এখন উপায়! একথা তুমি
আমাকে আগে জানাওনি কেন?”
“জানিনা। আমাকে আগামীকাল দেখা করতে হবে।”
“কার সাথে?”
“বিজ্ঞান কাউন্সিলের ফ্যামিলি প্ল্যানিং-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডেভিড হুপারের সাথে।”
“ডেভিড হুপার, উনার সাথেই তো আমি
বাইর্ভালারে চড়ে এলাম। অতি সাধারণ একজন মানুষের মতো।”
“উনি সাধারণ মানুষের মতো থাকেন, আসলে উনি অসাধারণ ক্ষমতাধারী
রোবট।”
“নীহা, আমি যাই, আমাকে সারারাত ভাবতে হবে। একটা উপায় বের না
করলে আমাদের যেকোন একজনকে নির্ঘাত মরতে হবে।”
রিকি যাওয়ার আগে নীহার কাছে এলো, খুব কাছে। তারপর নীহার
ঠোটে চুমু দিয়ে বললো-
“নীহা, তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?”
“হ্যাঁ রিকি, আমি তোমাকে বিশ্বাস
করি।”
রিকি তার ঘরে শুয়ে আছে। ডুকার ঘরের এক কোনে
দাঁড়িয়ে আছে।
“ডুকার, তুমি কি আমাকে কিছু বলবে?”
“জ্বি স্যার, আপনি যখন বাইরে বের
হচ্ছিলেন তখন আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করেছিলাম। প্রশ্নটি হচ্ছে- আপনি কোথায় যাচ্ছেন, আপনি তখন বললেন-জানিনা।
আপনি কোথায় যাচ্ছেন সেটা আপনি জানেন না, এটা কেমন কথা! আমি স্বয়ং
পাগলের রূপ ধারণ করতে যাচ্ছি।”
রিকি লাফ দিয়ে উঠে বসলো-“ডুকার
তোমাকে ধন্যবাদ।”
“কেন স্যার, আমি কি কোন সুস্বাদু
কথা বলেছি?”
“হ্যা, তুমি অত্যন্ত সুস্বাদু কথা বলেছো। তোমার কথা
থেকে আমি একটা বুদ্ধি পেয়েছি। যার জন্য আমাদের জীবন বেঁচে যেতে পারে।”
“স্যার, আমার জীবন কোথায়?”
“তোমার কথা বলছি না, আমার ও নীহার কথা বলছি।”
“নীহা মেয়েটি অত্যন্ত মসৃণ।”
“মসৃণ নয়, বলো সাধারণ।”
“নীহা মেয়েটি অত্যন্ত সাধারণ এবং উজ্জ্বল।”
“ডুকার, তুমি অত্যন্ত নির্বোধ।”
“আপনি আমাকে নির্বোধ বললেন, আপনার মুখ নিসৃত
বাক্যটি আমার হৃদয় যন্ত্রটিতে আঘাত হেনেছে। আমি সীমাহীন মর্মাহত হয়েছি।”
রিকি এই দুঃসময়েও হেসে ফেললো। রোবট জিনিসটা
খারাপ নয়। তাদের সহজ সরল কথা বার্তা খুব আনন্দ দেয়। মানুষের মতো জটিলতা তাদের
মধ্যে নেই। রিকি ঘুমিয়ে পড়লো।
সাকালে টাইসো রিকিকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো-
“স্যার উঠুন, সকাল হয়েছে। সূর্য আবার
পূর্ব দিক থেকে তার যাত্রা শুরু করেছে। এখন সকাল ৭টা বেজে ১৮ মিনিট ৪২ সেকেন্ড ৪৩ সেকেন্ড ৪৪ সেকেন্ড ৪৫
সেকেন্ড ৪৬ সেকেন্ড ...... ”
“থামো, প্রত্যেকদিন তোমাকে থামাতে হয়।”
“কি করবো স্যার, এক সেকেন্ড বলতেই পরবর্তী
সেকেন্ড শুরু হয়ে যায়, আমি আসলে আপনাকে সঠিক সময়টি বলতে চাই।”
“তোমার কফিটা খুব সুন্দর হয়েছে টাইসো।”
“আপনাকে সংখ্যাবিহীন ধন্যবাদ স্যার।”
কলিংবেল বেজে উঠলো, টাইসো দরজা খুলে দিলো-
“স্বাগতম নীহা, আপনার বন্ধু কিছুক্ষণ
আগে ঘুমপর্বটি শেষ করলো।”
রিকি এবং নীহা ড্রইংরূমে বসে আছে। ডুকার তাদের
পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। তার অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত-
“নীহা, আমাদের সমস্যার মনে হয় সমাধান খুজে পেয়েছি।”
“সত্যি বলছো।”
“হ্যা, তোমাকে কোন প্রশ্ন করলে তুমি বলবে- জানিনা।”
“তাহলে আমরা বেঁচে যাবো?”
“আমি ঠিক জানিনা, তবে আমার মনে হয় আমরা
বেঁচে যাবো।”
এমন সময় ডুকার রিকিকে বললে
“স্যার, আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো।”
“এখন তোমার সাথে কোন কথা নেই। তুমি যাও।”
ডুকার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো-“আমার কথা আপনাকে শুনতে হবে। ঞধর-২৬ মডেলের
রোবট যখন কিছু বলবে তখন সংশ্লিষ্ট সকল মানুষকে তার কথা শুনতে হবে। এটি কাউন্সিলের
নিয়মে লেখা আছে।”
রিকি চমকে উঠলো, ডুকারের কথাবার্তা কেমন
যেন অন্যরকম লাগছে। ডুকার এমন পাল্টে গেল কিভাবে?
“মিঃ রিকি, ঞধর-২৬ মডেলের রোবট বর্তমানে সবচেয়ে উন্নত। এই তথ্য আপনার জানা।”
রিকি আমতা আমতা করতে করতে বললো-“হ্যা”
“আমাদের মাঝে মানূষের সব অনুভূতি দেয়া হয়েছে।
আমরা মিথ্যা কথা বলতে পারি, আবার অভিনয়ও করতে পারি।”
“মিথ্যে কথা, অভিনয়! আমি ঠিক বুঝলাম না।”
“হ্যা, আমি এতদিন নির্বোধের মতো অভিনয় করেছি। সবচেয়ে
উন্নতধরনের রোবটরা নির্বোধ হবে, এটা আপনি ভাবলেন কিভাবে? আমি আপনাদের দুজনকেই
পছন্দ করি। আপনাদের সমস্যাটার সমাধান আমি করে দিবো।”
“আমরা এখন কি করবো?”
“আপনি যে বুদ্ধি বের করেছেন, তাতে খুব একটা কাজ
হবেনা। তবে এতে একটা লাভ হবে। কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। ”
“কিভাবে?”
“যদি কোন মেয়ে বলে যে, তার সন্তানের বাবা কে
তা সে জানেনা তখন কি করতে হবে তা ডেভিড হুপারের মতো রোবটের মাঝে প্রোগ্রামিং করা
নেই। এমন কথা কোন মেয়ে বলতে পারে সেটাই সে বুঝতে পারবেনা। ওর মাথায় জট পেকে যাবে।
ঐ জট খোলার জন্য সে কিছুদিন সময় নিবে। সেই সময়টা আমাদের কাজে লাগাতে হবে। ”
নীহা ফ্যামিলি প্ল্যানিং অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে
আছে। তাকে প্রথমে যেতে হবে চেক-আপ রূমে। কোনো প্রকার
অস্ত্র নিয়ে যেকোন অফিসে প্রবেশ নিষেধ। নীহা বিভিন্ন নিয়মের ভিতর দিয়ে ডেভিড
হুপারের কাছে পৌছালো। ডেভিড হুপার চেয়ারে বসে আছে।
“তুমিই সেই মেয়ে, লাইসেন্স ছাড়া বাচ্চা
নিয়েছো।”
“জ্বি হ্যা।”
“এই সন্তানের বাবা কে?”
“আমি জানিনা।”
“তার মানে, তুমি জাননা!”
“না, আমি জানিনা।”
“এটা কিভাবে সম্ভব? তুমি কেন জানবেনা?”
নীহা এই প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে বললো-“আমি কি এখন যেতে পারি?”
“হ্যা যাও, তুমি আবার দশদিন পর
আসবে।”
নীহা রিকির বাসায় চলে এলো। রিকি ও নীহা কথা
বলছে,
ডুকার
পাশে বসে আছে। রিকি নীহার
কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠলো-
“মাত্র দশ দিন! এই দশদিনে
কি সমাধান বের করবো।”
ডুকার বললো-“দশ দিন
অনেক সময়।”
“তোমার কাছে দশ দিন অনেক সময় হতে পারে কিন্তু
আমাদের কাছে খুব অল্প।”
“যা করার আমি করবো, তাই সময় নিয়ে ভাবনাটাও
আমার।”
রিকি ও নীহা খাচ্ছে। ডুকার কম্পিউটারে বসে কি
যেন করছে। টাইসো খাবার টেবিলের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। সে আজকে চুপ করে আছে।
রিকি বললো-“টাইসো, তুমি আজ চুপচাপ কেন? কি হয়েছে?”
“আমি আজ টেবিল পরিষ্কার করতে যেয়ে ফুলদানি
ভেঙ্গে ফেলেছি। আমি এজন্য অতিউত্তম দুঃখিত হয়েছি।”
“তুমি দুঃখ পেলে কিভাবে?”
“ডুকার আমার কপোট্রোন পাল্টে দিয়েছে। আমার
মধ্যে মানবিক গুনাবলীর সফ্টওয়্যার ইন্সটল করেছে।”
রিকি লাফ দিয়ে উঠলো-“তাহলেতো
সর্বনাশ!”
কম্পিউটারে কাজ করতে করতে ডুকার জবাব দিলো-“ভয় পাবেননা, তেমন কোন সমস্যা হবেনা।”
“ওর উদ্ভট কথাবার্তার জ্বালায়তো বাঁচিনা, আবার মানবিক গুনাবলী...”। রিকি হাল
ছেড়ে দেবার মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডুকারের দিকে তাকালো-“আমাদের সমস্যা নিয়ে কি
ভাবলে ডুকার।”
“নীহার জন্য একটি নকল লাইসেন্স তৈরী করেছি।”
“ নকল লাইসেন্স! সেটা দিয়ে
কি হবে?”
“ নকল লাইসেন্স দিয়ে নীহা এবোশান করাবে।”
“কিন্তু এতে একটা সমস্যা হতে পারে। লাইসেন্স
যাচাই করার জন্য কম্পিউটারে যখন প্রবেশ করাবে তখন একটা লাল আলো জ্বলবে।”
“নীহার সাথে আমি হাসপাতালে যাবো। ওখানে যে রোবট
লাইসেন্স যাচাই করে, ঐ ব্যাটাকে আমি দেখবো।”
নীহা ও ডুকার ফ্যামিলি প্ল্যানিং হাসপাতালে
লাইসেন্স চেক আপ রূমে দাঁড়িয়ে আছে। রোবটটি নীহার কাছ থেকে লাইসেন্স নিতেই ডুকার কি
যেন করলো,
তারপর
রোবটি একেরারে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। তখন ডুকার রোবটটির কপোট্রোনে ছোট্ট একটা
চিপ লাগিয়ে দিলো, এরপর রোবটটি আবার চালু হয়ে তার কাজ শুরু করে দিলো, লাইসেন্সটি কম্পিউটারে
প্রবেশ করাতেই লাল আলো জ্বলে উঠলো, কিন্তু রোবটটি কিছুই বললো না, সে একটি সত্যায়িত কাগজ
নীহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো- “৫ম তলায় রূম নম্বর ৫১৬-তে যাও।”
“ নীহা ও ডুকার ফ্যামিলি প্ল্যানিং হাসপাতালের
করিডোর ধরে হাটছে। ৫১৬ নম্বর রূমে যাচ্ছে তারা।”
ডুকার নীহাকে বললো-“নীহা, আপনি ৫১৬ নম্বর রূমে
যান,
আমি বাইরে
অপেক্ষা করছি।”
নীহা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো-“ডুকার, তুমি ঐ রোবটটিকে কি করেছিলে? লাল আলো জ্বললো, অথচ আমার কার্ড গ্রান্ট
করা হলো!”
“সামান্য একটু পরিবর্তন করেছিলাম, একটা রিভার্স ডিভাইস
চিপ লাগিয়ে দিয়েছিলাম। যার ফলে রোবটটি উল্টা কাজ করেছে।”
“তাহলেতো অন্যরা বিপদে পড়বে।”
“লাইসেন্সের কাজ শেষ হওয়ার পর ওর কপোট্রোন থেকে
চিপটি খুলে নিয়েছি।”
“ডুকার, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।”
রিকির ঘরে রিকি, নীহা ও ডুকার বসে আছে।
রিকিকে বেশ খুশি খুশি লাগছে।
“ডুকার, তুমি আমাদের খুব বড় একটা বিপদ থেকে মুক্তি
দিয়েছো।”
“না, আপনি ভুল বললেন, বিপদের সবচেয়ে বড় অংশ
এখনও রয়ে গেছে।”
“বিপদের বড় অংশ মানে!”
“সেদিন নীহা ডেভিড হুপারকে বলেছে- আমি জানিনা। সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা। ডেভিড হুপার ব্যাপরটি
বুঝতে পারেনি। এটা বোঝার জন্য সে এবার নীহার মাথা স্ক্যান করবে। ”
“বল কী!”
“এ ব্যাপারে আমি মোটামোটি নিশ্চিত। ”
“তাহলে উপায়!”
“একটা উপায় আছে। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, আমাকে যেদিন এখানে
প্রথম নিয়ে এলেন সেদিন নীহা আমাকে দেখে বুঝতে পারেনি যে, আমি মানুষ নাকি রোবট।
আমাদের সংখ্যা, মানে ঞধর-২৬ মডেলের রোবট আছে
মাত্র কয়েকটি। সবকটি রয়েছে বিশেষ এলাকায়। শুধু আমিই বাহিরে আছি। আমি আগামীকাল টাই
প্রোজেক্ট এলাকায় যাবো। সেখানে মেয়েদের আকৃতির একটি রোবটকে সার্জারী করে নীহার
চেহারা দিয়ে দিব।”
রিকি হতাশ হয়ে জিজ্ঞস করলো-“তাহলে কি হবে?”
“এরপর নীহার স্মৃতি কপি করবো, কপির অংশ থেকে ঐ ঘটনার
স্মৃতিটুকু বাদ দিয়ে বাকি অংশটুকু রোবট মেয়েটির কপোট্রোনে প্রবেশ করাবো। তারপর
তাকে পাঠিয়ে দিবো ডেভিড হুপারের কাছে। তারপর তোমরা সম্পূর্ণ মুক্ত।”
“ডেভিড হুপার যদি বুঝতে পারে, ও নীহা নয়, একটি রোবট।”
“ডেভিড হুপার মানুষ নয়, রোবট। ওর কাজ করা, চিন্তা করা, সবকিছুই ছকবাধা নিয়মে
চলে। আর ঞধর-২৬ মডেলের রোবট কতটা উন্নত তা আপনি খুব ভালই
জানেন।”
“ডুকার, ঐ মেয়ে রোবটটির নাম কি?”
“ওর নাম কিতান, আমি ওকে খুব পছন্দ করি।”
টাইসো খাবার নিয়ে এসেছে, ওর রান্নার প্রশংসা
করতেই হয়। অত্যন্ত চমৎকার রান্না করতে পারে।“”
টাইসো প্লেটে খাবার দিতে দিতে রিকিকে বললো-“স্যার, আমি কি আপনাদের সাথে গল্পে যোগ দিতে পারি? ”
“এক শর্তে, যদি তুমি কথার মাঝে
জটিল শব্দ না বলো, তাহলে।”
“এই অধম আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছে যে, সে কোন জটিল বাক্য মুখ
নামক যন্ত্র দিয়ে নির্গত করবে না।”
রিকি, নীহা ও ডুকার একসঙ্গে হেসে উঠলো। নীহা এই
প্রথম কোন রোবটের হাসি দেখলো। অবিকল মানুষের মতো, ভালবাসা মিশ্রিত হাসি।
……………………………………………………..
দশ বছর পরের ঘটনা। ডুকার ও কিতান দুজনই মহাকাশ
যাত্রায় ধ্বংস হয়েছে। রিকি ও নীহা এখন একসাথে থাকে, তবে টাইসো নেই।
মেকানিক্যাল সমস্যার কারণে রোবট তৈরীর কোম্পানীর কাছে ফেরৎ দেয়া হয়েছে, আর নতুন কোন রোবট আনা
হয়নি। বাসার কাজ
রিকি ও নীহা দু’জনেই করে। পৃথিবীতে অনেক বছর আগে বিয়ে নামে একটি ব্যাপার
ছিলো,
একটি ছেলে
ও একটি মেয়ের মাঝে ঘটতো। নীহা ও রিকি মনে করে তাদেরও বিয়ে হয়েছে। তাদের একটি ছেলে
হয়েছে,
ওর নাম
ডুকার। বয়স ছয় বছর। নীহা আবার সন্তান সম্ভবা। যদি এবার মেয়ে হয় তবে নাম রাখবে
কিতান আর ছেলে হলে রাখবে টাইসো।
…………………………………………………..



কোন মন্তব্য নেই