"ইথার ডায়েরী" (ফিরোজ হাসান)
“এই বই তুমি কোথায় পেয়েছো?” ডঃ ডুরান্ট শাওনকে
জিজ্ঞেস করলো-
“স্যার, এটি বই কিনা সেই ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত করে
কিছু বলা যাচ্ছেনা। লেখার ধরণ দেখে মনে হয়, প্রতিদিনের ঘটনা কেউ লিখে রেখেছে।”
“তুমি বলতে চাচ্ছো, কেউ ডায়রী লিখেছে!”
“আমারতো তাই মনে হয়।”
“ধরলাম এটি একটি ডায়রী, কিন্তু এত আগে কেউ
ডায়রী লিখতো বলে মনে হয়না।”
“আমি এই ডায়রীর পঠোদ্ধার করতে চাই।”
“তাহলে চুপচাপ বসে আছো কেন, তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করে
দাও।”
“ঠাট্টা করছেন?”
“আরে না। কিযে বলো তুমি... এটি পেয়েছো কোথায়?”
“মিশরে। তিনমাস আগে একবার মিশর গিয়েছিলাম, ডাইনোসরের ফসিল খুঁজতে।
তখন পেয়েছি।”
“তুমি এই ডায়রীর ব্যাপারে এত আগ্রহী কেন?”
“কারণ, ডায়রীটি খুব যত্ন করে প্যাকেট করা ছিলো।”
“মিশরে কবে যাচ্ছো?”
“আগামী পরশু।”
“একা যাচ্ছো?”
“না, আমার বন্ধু আরেফিন যাচ্ছে আমার সাথে।”
“ঠিক আছে যাও। Good luck.”
শাওন
ও আরেফিন এখন মিশরে। তাদের প্রথম কাজ হচ্ছে পিরামিড দেখা। যে পিরামিড নিয়ে হাজার
হাজার বছর ধরে চলছে নানারকম গবেষনা, সেই পিরামিড শাওনের এখনও অদেখাই রয়ে
গেছে। শাওন ও আরেফিন গাড়ীতে বসে আছে। গাড়ী
চলছে ঘন্টায় প্রায় একশ কিলোমিটার বেগে। শাওন আশেপাশের বাড়ীঘর দেখছে। বাড়ীগুলো
বেশীর ভাগ বোমার আঘাতে ভাঙ্গা নয়তো গুলিতে ঝাঁঝরা। শহরের পাশেই অন্তহীন মরুভূমি।
রাস্তার দু’দিকে তাকালে শুধু বালি আর বালি। মাঝে মাঝে
কিছু কাঁটা গাছ দেখা যাচ্ছে। গাড়ীর জানালা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও গায়ে ধুলো বালি
পড়ছিলো। অনেক ঝঞ্ঝাটের মধ্য দিয়ে তারা কায়রোর নির্দিষ্ট হোটেলে পৌছুলো।
হোটেলটি বেশ ভাল। ধুলোবালিতে আরেফিন একেবারে
কাহিল হয়ে পড়েছে-
“এ কোন শহরে এলামরে বাবা!”
“শোন, কষ্ট করলে শান্তি মেলে।”
“আচ্ছা শাওন, আমরা মিশরে এলাম কেন?”
“কী বললি!”
“বললাম, আমাদের মিশরে আসার কারণটা কী?”
“সাতখন্ড রামায়ণ পড়ে সীতা রামের মাসী।”
“আমি রামায়ণের শুধু তিনখন্ড পড়েছি.....”
“একবারতো বললাম, একটি ডায়রীর পঠোদ্ধার
করতে এসেছি।”
“তারজন্য মিশরে আসতে হবে কেন?”
“ডায়রীটা মিশরেই পেয়েছি, আর এই ডায়রীর সাথে
নিশ্চয়ই পিরামিডের কোনো সম্পর্ক আছে।”
“কিভাবে বুঝলি সম্পর্ক আছে?”
“ডায়রীর উপরে পিরামিডের ছবি আঁকানো আছে। এছাড়া
ভিতরে এমন অনেক ছবি রয়েছে যা পিরামিড গবেষকদের উদ্ধারকরা অনেক পূরাকীর্তিও সাথে
মিলে যায়। ”
পরদিন
সকালে শাওন ও আরেফিন গেল পিরামিড দেখতে। কায়রো শহরের অদূরে ছোট্ট একটি এলাকা।
জায়গাটির নাম গিজে। প্রথমেই শাওনের ধারনা ভুল প্রমানিত হলো পিরামিডের বিশালতা
দেখে। আরেফিনতো একেবারে হা !
“দোস্ত আমারতো মনে হয় এই পিরামিডের ভিতরে আস্ত
একটা শহর অনায়াশে ঢুকিয়ে দেয়া যাবে।”
“বাজে প্যাঁচাল বাদ দে। আমার তো আগে ধারণা ছিলো, পিরামিডের গাঁ বোধহয়
মশৃণ,
কিন্তু
এখনতো দেখছি খাঁজকাটা। দিব্বি হেঁটে উপরে যাওয়া যাবে।”
“যাবি নাকি উপরে!”
“না, আমি ভিতরে যাব।”
“বলিস কী! সত্যিই
ভিতরে যাবি নাকি!”
“কেন, তোর কি কোনো অসুবিধা আছে?”
“না মানে, মমি সাহেবেরা যদি আর আসতে না দেয়!”
“আর একটা বাজে কথা বলবিতো দিবো একটা লাথি। ”
পিরামিডের ভিতরে প্রবেশ করে দু’জনেই অবাক হয়ে গেল। ভিতরের আবহাওয়া অস্বাভাবিক আর্দ্র। মাঝে
মাঝে কিছু অচেনা প্রাণী, বিড়াল, পাখীর মৃত দেহ দেখা যাচ্ছে। যা আপনা আপনি
মমিতে পরিণত হয়েছে। শাওনের সাথে তাদের গাড়ীর ড্রাইভারও রয়েছে, এতে অনেকটা সুবিধা
হচ্ছে।
“আচ্ছা বলুনতো, ভিতরে এমন ঠান্ডা কেন?”- ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস
করলো শাওন।
“এ কথা কেউ বলতে পারেনা।”
“দেয়ালে ওসব কী আঁকানো?”
“মন্ত্র।”
“মন্ত্র! কীসের মন্ত্র?”
“যারা লিখেছে তারাই জানে।”
“কারা লিখেছে?”
“জানিনা। হয়তো সেনেফেরুর নির্দেশে লেখা হয়েছে।”
“সেনেফেরু মানে.... রাজা সেনেফেরু?”
“হ্যাঁ, খ্রীষ্টপূর্ব ২৭০০ বছর আগের রাজা।”
আরেফিন একটা কথা না বলে পারলোনা,“দোস্ত, ও ব্যাটা এমনভাবে বলছে, যেন সেনেফেরুর সাথে ওর
ব্যক্তিগত পরিচয় ছিলো”।
শাওন আরেফিনের কথা কানে নিলো না, সে আবার তার ড্রাইভারকে
জিজ্ঞেস করলো,“এই প্রাণীগুলো পঁচেনি কেন?”
“প্রাণীদেহ পঁচতে যা দরকার, পিরামিডে হয়তো তা নেই।
আপনারা এক কাজ করুন, এখানে পিরামিডের উপর কিছু ভাল বই পাওয়া যায়, কিনে ফেলুন, কাজে লাগবে।”
শাওন পিরামিডের উপর বেশ কিছু বই কিনেছে। সবকটি
পড়া শেষ। বেশ কিছু তথ্য সে তার ডায়রীতে নোট করেছে। যেমন-
১. মিশরের সাক্কারাতে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে
পৃথিবীর প্রথম পিরামিড তৈরী হয়েছিলো।
২. অনেকে দাবী করেন যে, পিরামিড সৃষ্টিতে
অন্যকোন জগতের অতি উন্নত প্রাণীর অবদান আছে।
৩. প্রাচীন মিশরীওদের রা-এর প্রতি
প্রচন্ড বিশ্বাস এবং ভক্তি ছিলো। ‘রা’- প্রাচীন মিশরীওদের সূর্যদেবতার নাম।
৪. বর্তমানে পিরামিড সম্পর্কে দু’টি ধারণা রয়েছে। কেউ বলে, ওগুলো ফারাওদের কবর আবার অনেকে মনে করে ওগুলো
প্রাচীন মিশরীওদের ধর্মমন্দির।
৫. পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, পিরামিডে প্রবেশকারী
প্রায় সকলেই কোনো না কোনো অপঘাতে মারা গেছে।
একটি ব্যাপার শাওনের কাছে বেশ অদ্ভুত লেগেছে। ঘটনাটি বইয়ে এইভাবে লেখা আছে-
“...একবার সম্রাট নেপোলিয়ান
এসেছিলেন পিরামিড দেখতে। গিজে’র পিরামিডে প্রবেশ করার
ইচ্ছে হলো তার। পারাওদের কক্ষে ঢুকে তিনি অন্য সবাইকে বের হয়ে যেতে বললেন। খানিকটা
থাকার পর হঠাৎ করে তিনি বের হয়ে এলেন। তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে আসার কারণটা তিনি
কাউকে জানালেন না। পরে জানা গিয়েছিলো যে, ফারাওদের কক্ষে তিনি ভূত দেখতে পেয়েছিলেন। -এরপর একটা অদ্ভুত লাল আলো নাকি দেখতে পান নেপোলিয়ান তার
ঘরের কোনে। আলোটা নাকি জ্বলছিলো আর নিভছিলো। এরপর বাকী জীবনটা নেপোলিয়নের কেটেছে ‘লাল মানুষের’ দুঃস্বপ্ন দেখে। প্রায়
তিনি ঘুম থেকে চেঁচিয়ে উঠতেন “লাল মানুষ” “লাল মানুষ” বলে।”
আট
মাস পরের ঘটনা, শাওন তার স্যার ডঃ ডুরান্টের রূমে বসে আছে। এই আট মাসে তার
স্যারের বয়স মনে হয় আট বছর কমে গেছে।
“কী খবর তোমার শাওন?”
“ভাল স্যার।.......স্যার, আমি ইথা’র ডায়রীর
পাঠোদ্ধার করেছি।”
“ইথা আবার কে?”
“Sorry স্যার। বলতে ভুলে গেছি, মিশরে গিয়ে ঐ ডায়রীর
ভাষা আমি উদ্ধার করেছি।”
“তাই নাকি!”
“জ্বি স্যার। ডায়রীটা যে লিখেছে তার নাম ইথা।”
“কী লিখেছে ঐ ডায়রীতে?”
“এলোমেলোভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা। বুঝতে
সমস্যা হচ্ছিলো, তাই আমি কিছু সংযোগ করে একটা কাঠামো দিয়েছি।”
“কোথায়? আমাকে দাও।”
শাওন ডঃ ডুরান্টকে ডায়রীর অনুবাদ করা কিছু
কাগজ পড়তে দিলো।
ইথার ডায়েরী
“...আমি রা’কে বিশ্বাস করি না। রা মিথ্যা। টেটি আমাকে রা-এর কাছে উৎসর্গ করবে। আমি চোর, এই কারণে নয়। কারণ, আমি রা’কে বিশ্বাস করি না। টেটির আদি বংশ ভাল ছিলো। প্রজাদের ভালবাসতো। আমি এখানেই থাকবো। পিরামিডের ভিতরে আমাকে কেউ ধরতে আসবে না। আমি দিনের বেলা ফারাওদের কক্ষে লুকিয়ে থাকি। এখানে সাধারণত কেউ আসে না। ফারাওদের মমি অত্যন্ত সুরক্ষিত। কক্ষটি ভয়ংকর। আমি ভয় করি না, আমার কোনো কিছুতেই ভয় নেই। টেটি সবাইকে বলেছে, রা- তার আদি পুরুষদের পিরামিড তৈরী করে দিয়েছে। কিন্তু টেটির কথা মিথ্যা। পিরামিড রা তৈরী করেনি। রা বলতে কিছু নেই। পিরামিড অনেক আগে থেকেই এখানে আছে। যেমন গাছপালা, পাহাড়, সমুদ্র, তেমনি পিরামিড। এসবকিছু কে সৃষ্টি করেছে! কে সে...”
“....আমাকে কে যেন ঘুম থেকে
ডেকে তুললো। আমার মনের ভুল নিশ্চয়ই! ফারাওদের কক্ষে ছয়টি
মমি আছে। পিরামিডে কেন মমি রাখতে হবে আমি বুঝিনা। আগের দিনের মতো মাটিতে পুঁতে
রাখলেইতো ভাল হয়। রাজারা আবার জীবিত হতে চায়। রাজারা পিরামিডকে নিজেদের স্বার্থে
ব্যবহার করছে...”
“আমি রাতে ফারাওদের
কক্ষে কথা শুনতে পাই। কথার মানে কিছুই বুঝতে পারিনা। কে বা কারা কথা বলে কিছুই আমি
জানিনা। একরাতে আমি পিরামিডের ভিতরে আগুন দিয়ে আলো জ্বালিয়ে রাখলাম। মাঝরাতে আমার
ঘুম ভেঙে গেল। আমি উঠে দাঁড়ালাম, তখন কে যেন বললো-
“তোমার নাম কি ইথা?”
“হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কে?”
“তোমার ধ্যান ধারণা ভবিষ্যতের মানুষের মতো।
তোমার জন্ম পরে হওয়া উচিত ছিলো।”
“আপনার কথা আমি বুঝতে পারলাম না।”
আমি
একটি মমির সাথে কথা বলছি। মমিরা কথা বলতে পারেনা জানি। কিন্তু এরা পারে। কেন পারে, কিভাবে পারে জানিনা।
আমার তবুও ভয় করছিলো না। হঠাৎ পাশের আরেকটি মমি কথা বলে উঠলো.....
“সাইরো, তুমি কার সাথে কথা বলছো!”
“ইথা’র সাথে।”
“ইথা, তুমি চলে যাও। আমরা পাপী, অপরাধী।”
“হিপার, তুমি এভাবে কেন বলছো?”
“ঠিকই বলছি। আমরা ভবিষ্যতের মানুষের সাথে
বিশ্বাসঘাতকতা করেছি।”
“আমরা করিনি, ফারাওরা করেছে। ওরা
ভবিষ্যতের মানুষের টাইমমেশিন ধ্বংস করে দিয়েছে। এই পিরামিডগুলো অভিশপ্ত। ফারাও
রাজা ধ্বংস হয়েছে তার অহংকারের কারণে।”
আমি
দুই মমির কতাবার্তা শুনছিলাম। তাদের কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারিনি। টাইমমেশিন, ভবিষ্যতের মানুষ- এসব আবার কি? তবে এতটুকু বুঝতে পারলাম যে, কথাগুলো খুবই
গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ আমার মনে হলো, এদের কথাগুলো আমার লিখে রাখা দরকার, যদি কখনও কাজে লাগে? একটা ব্যাপারে আমার বেশ
অবাক লাগছে, মমিদের আত্মা ফিরে এলো কিভাবে? তারা কথা বলছে চোখ বন্ধ
রেখে। ঠোঁটটা শুধু হালকা নড়ছে। কিছুক্ষণ পর ওদের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেলো। আমি
বাইরে বের হয়ে এলাম। একটু পরেই ভোর হবে।”
“দিনের বেলা বের হতে
পারিনা। টেটি আমাকে মেরে ফেলবে। গতরাতে কিছু খাইনি। আজও বোধহয় না খেয়েই থাকতে হবে।
আজ রাতে আমাকে খাবারের খোঁজে বের হতে হবে। লেখার জন্য পাতা আনতে হবে। আজ রাতে আমি
মমিদের কথা শুনতে পাবনা।”
“তিনদিন চলে গেল মমিদের
নিরবতায়। আমি ব্যাপারটি কিভাবে নিবো ঠিক বুঝতে পারছিনা। মমিরা কি সত্যিই কথা
বলেছিল,
নাকি আমার
মনের ভুল! না, মনের ভুল না। কারণ, এরপরের রাতই আমি আবার
ওদের কথা শুনতে পেলাম.......... ”
“ইথা, তুমি কেমন আছ?”
“ভাল। আপনার নাম কি?”
“আমি সাইরো। তুমি আমাদের কথা লিখে রাখতে চাও?”
“আপনি জানলেন কিভাবে!”
“অযথা প্রশ্ন করোনা। তুমি কি আমাদের একটি
অনুরোধ রাখতে পারবে?”
“কী অনুরোধ, বলুন।”
“আমাদের তুমি অভিশাপ থেকে মুক্ত করে দাও। আমরা
অনেক অপরাধ করেছি। এই পিরামিড ভবিষ্যতের মানুষদের ফিরিয়ে দাও।”
“আমি কিভাবে ফিরিয়ে দিব?”
“পিরামিড ধ্বংস করে দাও।”
“এতবড় এবং এতগুলো পিরামিড আমি একা কিভাবে ধ্বংস
করবো?”
“জানিনা।”
“পিরামিড ধ্বংসের সাথে আপনাদের অভিশাপের কী
সম্পর্ক?”
“আছে, অনেক বড় সম্পর্ক আছে।”
“আপনারা কিভাবে কথা বলছেন?”
“আমরা জীবিত।”
“জীবিত! তাহলে এখানে, এই অবস্থায় কেন?”
“আমাদের নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই। আমরা অভিশপ্ত।”
“আমাকে সব কথা বলা যায় কি?”
“পিরামিড হচ্ছে পৃথিবীর সর্বশেষ প্রযুক্তি।”
“প্রযুক্তি কী জিনিস?”
“তুমি বুঝবে না। আমি যা বলছি, শুধু শুনবে।”
“ঠিক আছে আপনি বলুন।”
“পৃথিবী একটি চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছে। যার
শুরু এবং শেষ একই বিন্দুতে অবস্থিত। প্রকৃতির কোন এক ভুলের কারণে পৃথিবীর যাত্রা
শুরু হয়েছিলো তার শেষের কিছু দিনগুলি দিয়ে। আর সেই দিনগুলিতে পৃথিবীর মানুষেরা
তাদের অতি উন্নত যন্ত্র দিয়ে কোন একটি এলাকার অভিকর্ষিয় ত্বরণ শূণ্য করে সেখানে
পিরামিড তৈরী করেছিলো। এরপর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে পিরামিডগুলো
অক্ষত অবস্থায় থেকে যায়। সৃষ্টির আদি থেকে পিরামিডগুলো নানা কাজে ব্যবহার হয়ে
আসছে। একসময় তা ফারাওরা দখল করে নেয়। পৃথিবীর জীবনচক্রে ভবিষ্যতের ঘটনাগুলো আগে
ঘটে গেছে। এতে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে, তাই ভবিষ্যতের মানুষেরা এসেছিলো পিরামিডগুলো
ধ্বংস করতে। আমরা তাদের ব্যাপারটি বুঝতে পেরেছিলাম, তাই তাদের টাইমমেশিন
ধ্বংস করে সবাইকে হত্যা করি।”
“ভবিষ্যতের মানুষেরা আমাদের চেয়ে নিশ্চয়ই অনেক
বুদ্ধিমান, তাহলে ওদের হত্যা করলেন কিভাবে?”
“রাতে। ওরা যখন ঘুমিয়ে ছিল তখন আমরা ওদের
টাইমমেশিনে বড় বড় পাথর নিক্ষেপ করি। ওরা কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওদের হত্যা করি।
তাছাড়া,
ওরাতো
যুদ্ধ করতে আসেনি, ওদের সাথে তেমন অস্ত্রও ছিলনা।”
“পিরামিড তৈরীর উদ্দেশ্য কী?”
“আশ্রয়কেন্দ্র। ভবিষ্যতের মানুষরা নিজেদের সকল
দূর্যোগ থেকে রক্ষা করার জন্য পিরামিড তৈরী করবে।”
আমি
এদের কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবুও লিখে রাখলাম। অন্যকেউ যদি ওদের কথা
বুঝতে পারে।
বেশকিছুদিন পর পিরামিডের ভিতর একটি অদ্ভুত
ব্যাপার ঘটে গেল। আমি গভীর রাতে খাবার নিয়ে পিরামিডে ফিরছিলাম। পিরামিডে ঢুকে
স্বাভাবিকভাবে ফারাওদের কক্ষের দিকে এগুচ্ছিলাম। এমন সময় কথা শুনতে পেলাম-
“সাইরো, তুমি ইথাকে সব বলে দিয়েছো কেন?”
“আমরা অভিশপ্ত।”
“হিপার, তুমিওতো বলেছো।”
“আমরা দুজন বন্ধু।”
“ইথা একাএকা কিছুই করতে পারবেনা।”
“ফারাও, আপনি ভবিষ্যতের মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা
করেছেন।”
“চুপ কর।”
আমি
আস্তে আস্তে ফারাওদের কক্ষের কাছে গেলাম। সাইরো ও হিপার একটি লাল আলোর সাথে কথা
বলছে। ঠিক লাল আলো নয়, লাল মানুষ। আমি খুব সাবধানে আমার সব জিনিসপত্র নিয়ে পিরামিড
থেকে বের হয়ে এলাম। বাইরে দিনের বেলা আমাকে টেটির লোকজন দেখলেই মেরে ফেলবে। আমাকে
রা-এর উদ্দেশ্যে হত্যা করবে। আমি যদি আবার
পিরামিডে ফিরে যাই তবে লাল মানুষ আমাকে মেরে ফেলবে। টেটিকে এসব কথা বললে সে
বিশ্বাস করবে না, আমার লেখা সব পাতা সে নষ্ট করবে। আমি রা-কে বিশ্বাস করিনা। রা মিথ্যা।
আমি
রাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নের ঘটনাগুলি ছিলো ঠিক এরকম- অনেক মানুষ কাজ করছে। ছেলে, মেয়ে সবাই। অচেনা সব
যন্ত্রপাতি, কেমন অদ্ভুত দেখতে। ঐসব যন্ত্র দিয়ে সবাই বড় বড় পাহাড় টেনে
আনছে। সবার গায়ে অচেনা পোষাক। সবকিছু কেমন যেন বিশ্ময়কর। একটা জায়গায় সবাই ভেসে
বেড়াচ্ছে,
বিশাল
একটা পাথরখন্ডও ভাসছে। সবাই কাজ করছে আবার আনন্দও করছে-
“টম, আমরা যদি সমস্ত পৃথিবীটাকে অভিকর্ষিয় ত্বরণ
মুক্ত করতে পারি তবে প্লেনের ভাড়া বেঁচে যেত। কী বলো, হাঃ হাঃ হাঃ”
হঠাৎ
সবাই মাটিতে পড়ে গেলো। পিটার কৃত্তিম মাধ্যাকর্ষণ সৃষ্টিকারী যন্ত্রটি বন্ধ করে
দিয়েছে।
“এখন লাঞ্চ টাইম। টম, কাঁদার ভিতর গড়াগড়ি
খেতে কেমন লাগছে?”
“ভাল লাগছেনা পিটার, তবে পা-টা ভাঙলে কাজ করা থেকে রেহাই পেতাম।”
আমি
বুঝতে পারলাম, স্বপ্নে আমি যা দেখেছি তা হচ্ছে, ভবিষ্যতের মানুষেরা
পিরামিড তৈরী করছে। যে ঘটনাটি সৃষ্টির আদিতে ঘটে গেছে।
ডঃ
ডুরান্ট ইথা’র ডায়রীটি বন্ধ করলো। শাওন তাকিয়ে আছে তার
দিকে-
“এর পরের ঘটনা কী হবে শাওন?”
“স্যার, এটি কোন গল্প, উপন্যাস নয়।”
“এখন তুমি কী করতে চাচ্ছো?”
“পিরামিড গবেষকদের ব্যাপারটি জানাবো।”
“কবে জানাবে?”
“কয়েকদিনের মধ্যেই। সাইরোর অনুরোধ ইথা রাখতে
পারেনি,
ওর হয়ে
আমাদের রাখতেই হবে।”
“শাওন, আমি ফারাওদের কক্ষ দেখতে চাই।”
“সত্যিই আপনি দেখতে চান!”
“হ্যাঁ, পিরামিডগুলো ধ্বংস করার আগে একবার দেখা দরকার।”
শাওন
ও ডঃ ডুরান্ট গিজের পিরামিডে ফারাওদের কক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের আরও কিছুদিন আগে
আসার কথা ছিলো কিন্তু শাওন ইথা’র ডায়রী নিয়ে ব্যস্ত
ছিলো। শাওন সাইরোর অনুরোধ রাখতে পেরেছে।
ফারাওদের কক্ষটিতে কেমন যেন একটা ভূতুড়ে ভাব
আছে। সবসময় মনে হয়, কে যেন তাকিয়ে আছে। হঠাৎ একটা শব্দ হলো। শাওন ও ডঃ ডুরান্ট
পিছনে তাকালো। মাটিতে লাল আলো জ্বলছে। সেখানথেকে একটি কন্ঠ ভেসে এলো-
“শাওন, তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। যে কাজটি ইথাকে
করতে দেইনি, সেই কাজ তুমি করলে! তুমি যখন আমার অমর
রাজত্ব ধ্বংস করার ব্যবস্থা করেই এসেছো, তখন তোমাকে তো আর...”
অনেক বছর পর-
পিরামিড তৈরীর প্রোজেক্ট হাতে নিয়েছে মানুষ। অভিকর্ষিয় ত্বরণ শূণ্য করে বড় বড় পাথর মাটিতে বসানো হচ্ছে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যেখানে নেই সেখানে মানুষ ভেসে বেড়াচ্ছে। ছেলে, মেয়ে সবাই কাজ করছে আবার আনন্দও করছে-
“টম, আমরা যদি সমস্ত
পৃথিবীটাকে অভিকর্ষিয় ত্বরণ মুক্ত করতে পারি তবে প্লেনের ভাড়া বেঁচে যেত। হাঃ হাঃ
হাঃ”
হঠাৎ
সবাই মাটিতে পড়ে গেলো। পিটার কৃত্তিম মাধ্যাকর্ষণ সৃষ্টিকারী যন্ত্রটি বন্ধ করে
দিয়েছে।
“এখন লাঞ্চ টাইম। টম, কাঁদার ভিতর গড়াগড়ি
খেতে কেমন লাগছে?”
“ভাল লাগছেনা পিটার, তবে পা-টা ভাঙলে কাজ করা থেকে রেহাই পেতাম।”
হঠাৎ টম চমকে উঠলো। তার কেনজানি মনে হচ্ছে, এমন একটি ব্যাপার এর আগেও ঘটেছে।.....সে ঠিক মনে করতে পারছে না।
.............................................................................................................






কোন মন্তব্য নেই