Header Ads

“দ্বিতীয় অনুভূতি”–(ফিরোজ হাসান)

 


 

- তাহলে আপনার কথা আমাকে বিশ্বাস করতে বলছেন?

আজমল হোসেন কোনো কথা বললেন না। মাথা নিচু করে বসে রইলেন। -চুপ করলেন কেন? তারপর কী হলো সেটা বলুন!

-বলতে ইচ্ছা করছে না।

-আমার কথায় কি রাগ করেছেন নাকি?

-না। রাগ করার কী আছে? আমার কথাটা বিশ্বাস করার মতো না।

-তাহলে বলছেন কেন?

-ঘটনাটা পুরোটাই সত্যি। আমি কখনো মিথ্যা কথা বলি না স্যার।

-আপনার ব্যাপারটি অন্য কেউ কি দেখেছে কখনো?

-না, দেখেনি।

-আপনি কী করেন?

-জি আমি গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার।

-আপনার ঘটনা পুরোটা বলেন। হাতটা কীভাবে হারালেন সব বলুন আজমল সাহেব এক গ্লাস ঠান্ডা পানি পান করলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার গল্প বলা শুরু করলেন।

 

-স্যার, আমি খুব গরিব ঘরের ছেলে। কারো সাথে কখনো ঝগড়াঝাঁটি করি না। নিজের মনে একা একা থাকি। স্কুলে পড়াই আর বিকেলে কিছু ছেলেমেয়ে বাসায় আসে, তাদের আমি প্রাইভেট পড়াই। এর জন্য কারো কাছ থেকে কোনো টাকা নিই না। বাড়িতে আমি আর আমার স্ত্রী থাকি, আমাদের কোনো ছেলেমেয়ে নেই। দুজনের সংসার, স্কুলের বেতনে মাসটা চলে যায়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। স্কুলের কাজে শহরে এসেছিলাম, সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে বাসে উঠলাম গ্রামে আসব, রাত তখন ১০টা বাজে। এক-দেড় ঘণ্টা সময় লাগে গ্রামে পৌঁছাতে। গ্রামে পৌছানোর ১০-১৫ মিনিট বাকি, এমন সময় আমাদের বাসের সাথে একটা ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘন কুয়াশার কারণে এই বিপত্তিটা ঘটে। ঘটনাস্থলেই জন মারা যায়। আহত হয় জন। এই জনের মধ্যে আমি একজন। বাস ট্রাকের প্রচণ্ড ধাক্কায় আমি জ্ঞান হারাই। সকালে যখন আমার জ্ঞান ফিরে আসে তখন আমি হাসপাতালে। আমার বাম হাত পুরোপুরি থেঁতলে গেছে। ডাক্তাররা জানাল হাতটা কেটে ফেলতে হবে। আমি অনেক অনুরোধ করলাম, যেভাবেই হোক আমার হাতটা যেন ঠিক করে দেয়। কিন্তু হাতটা ঠিক করার মতো অবস্থায় ছিল না। কেটে ফেলতে হলো। দুই সপ্তাহ পর হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরলাম। হাতটার জন্য সব সময় কষ্ট হতো। মাঝে মাঝে মনে থাকত না যে, আমার বাম হাতটা নেই। বাম হাতে কিছু ধরতে গিয়ে যখন ধরতে পারতাম না, তখন খেয়াল হতো।

 

একদিন রাতের ঘটনা-আমি বিছানায় শুয়ে থেকে গল্পের বই পড়ছি, আমার স্ত্রী পাশে ঘুমিয়ে আছে। বইটি আমি ডান হাতে ধরেছি। আমার বাম পাশে বিছানার সাথেই লাগানো একটি ছোট টেবিলে খাতা, কলম, এক গ্লাস পানি ছিল এবং একটি হারিকেন জ্বলছিল। একসময় আমার পানির পিপাসা লাগে, তখনো আমি বইটির মাঝেই ডুবে ছিলাম। নিজের অজান্তেই বাম হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে গ্লাস ধরলাম এবং পানি খেলাম। কিছুক্ষণ পর আমার খেয়াল হলো, আমি তো ডান হাতে বইটি ধরে আছি, তাহলে পানি খেলাম কোন হাতে? আমি প্রথমে একটু ভয় পেয়েছিলাম। তারপর খুশিই হলাম, খুশিতে আমার স্ত্রীকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। ঘুম ঘুম চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হইছে"?

 

আমি মহা আনন্দে তাকে বললাম, “আমি বাম হাতে পানি খেয়েছিতুমি বাম হাতে পানি খাইছো মানে”?

 

সত্যি বলছি। ডান হাতে বইটা ছিল আর বাম হাতে গ্লাসটা ধরে পানি খেলাম"

তোমার তো বাম হাত নাই! তাহলে গ্লাস ধরলা ক্যামনে ? “জানি না কীভাবে ধরেছি। কিন্তু আমি সত্যি বলছি, বাম হাতে আমি গ্লাস ধরেছি

ঠিক আছে, আবার ধইরা দেখাও তো..."

 

আমি দ্বিতীয়বার বাম হাতে গ্লাসটা ধরতে গেলাম, কিন্তু পারলাম না। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। আমার স্ত্রী আর কোনো প্রশ্ন না করে। শুয়ে পড়ল। আমিও বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। আসলেই কি আমি বাম হাতে গ্লাস ধরেছিলাম, নাকি ডান হাতেই গ্লাস ধরে পানি খেয়েছিলাম! শুয়ে থেকে এসব চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার স্ত্রী নিজের মনে একা একা কাজ করতে লাগল। আমার সাথে কোনো কথাই বলল না। আমিও ব্যাপারটি তেমন আর গুরুত্ব দিলাম না। স্কুলে গেলাম, স্কুল থেকে বাসায় ফিরলাম। সবকিছু আগের মতোই চলতে লাগল। এর পাঁচ দিন পরের ঘটনা। আমি আর আমার স্ত্রী ঘুমিয়ে আছি, হঠাৎ গভীর রাতে আমার স্ত্রীর চিৎকার শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেল। জেগে দেখি, আমার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না। আমি ওর কাছে যেতেই আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগল। বুঝতে পারলাম, কোনো এক কারণে আমাকে প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে। কারণটা ধরতে পারলাম না। সারারাত ঘরের কোণে বসে রইল। আমি আর ঘুমাতে পারলাম না। সকালে আমি নিজেই রান্না করতে গেলাম। এক হাতে কষ্ট করে অল্প কিছু রান্না করলাম। হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে প্রচণ্ড শব্দ আসতে লাগল। আমি তাড়াতাড়ি ঘরের ভেতর গেলাম। গিয়ে দেখি, আমার স্ত্রী ঘরের সব আসবাবপত্র ফেলে দিচ্ছে....

এক মিনিট, যেসব জিনিস আপনার স্ত্রী ফেলে দিয়েছেন তার ভেতর এমন কোনো ভারী জিনিস কি ছিল, যা তার পক্ষে একা নড়ানো সম্ভব না”! “স্যার, আমরা গরিব মানুষ। ঘরে তেমন জিনিস কিছুই নেই

তারপর কী হলো?

“... আমার স্ত্রী আর এখানে থাকবে না, বাপের বাড়ি যাবে। কেন, কী সমস্যা এসব কিছুই বলল না। শেষ পর্যন্ত তাকে বাপের বাড়িতে রেখে আসতে হলো। সেখান থেকে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। বাসায় এসে ঘরের সব জিনিসপত্র সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে শুরু করলাম। কখন যে দুই হাতে কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম খেয়ালই করিনি। যখন বুঝতে পারলাম তখন আমি নিজেও ভড়কে গেলাম। এটা কীভাবে সম্ভব! আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।

 


ঘটনা দুটি কবে ঘটেছিল”?

প্রথম ঘটনাটা ঠিক এক মাস ছয় দিন আগে ঘটেছিল, আর দ্বিতীয়টা তার পাঁচ দিন পর

"এরপর আর এমন ঘটেনি?

জি ঘটেছিল। আরও একবার ঘটেছিল।

কবে”?

"পনেরো দিন আগে"

বলুন, সেই ঘটনাটা বলুন"

স্ত্রীকে রেখে আসার দুই সপ্তাহ পর আমি ওকে আনতে গেলাম। বাড়ির সবাই স্বাভাবিক আচরণ করল। আমার স্ত্রীও খুব স্বাভাবিক ছিল। তাকে নিয়ে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরলাম। আগের কোনো বিষয় নিয়ে ওর সাথে আলোচনা করলাম না। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার স্ত্রী মারা গেছে।

বলেন কী! কীভাবে মারা গেল”!

জানি না। দুপুরের দিকে পুলিশ এল, আমাকে গ্রেপ্তার করল। আমার স্ত্রীর লাশ ময়নাতদন্তে পাঠাল। সেখান থেকে রিপোর্ট এল, আমার স্ত্রীকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। গলায় শুধু বাম হাতের চিহ্ন রয়েছে। গত পরশু পুলিশ আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, তবে নজরে রেখেছে।

 

তার মানে, আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, এই খুন আপনি করেছেন"? “আমি জানি না। রাতের বেলা কী হয়েছিল আমার কোনো কিছুই মনে নেই

আপনি যদি বাম হাতে গ্লাস ধরতে পারেন, ঘরের জিনিস গোছাতে পারেন, তাহলে নিজের স্ত্রীকে গলা টিপে হত্যা করতে পারেন না কেন”? “আপনি ঠিকই বলেছেন..."

এসব কথা আপনি আমাকে কেন বলছেন, পুলিশকে বলুন। আমি তো পুলিশ না

 

পুলিশকে কীভাবে বিশ্বাস করাব আমি বাম হাতে কাজ করতে পারিদেখুন আজমল সাহেব, আমি ঢাকায় একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইক্লোজি পড়াই। এর মানে এই না যে, আমি মনোবিজ্ঞানের মহাপণ্ডিত। আপনাদের গ্রামের আনিসুল হক আমার বাল্যকালের বন্ধু। বেচারা ক্যানসারে ভুগছে। লাস্ট স্টেজ। আমাকে অনেক অনুরোধ করেছে 'টা দিন যেন ওর এখানে এসে থেকে যাই। সে জন্য আমি সাত দিনের ছুটি নিয়ে এসেছি আমার বন্ধুকে দেখতে, আপনাকে দেখতে নয়। তা ছাড়া আপনি আমার খবর পেলেন কীভাবে”?

 

স্যার রাগ করবেন না। গ্রামে কোনো নতুন অতিথি এলে খবর সব দিকেই ছড়াইয়া যায়। তাছাড়া আনিস ভাই তো রোগী। ওনার খবর সবাই রাখে। আমি আপনার কাছে এসেছিলাম শুধু একটা বিষয় জানতে

 

কী জানতে চান”?

আমার সমস্যাটা আসলে কী। মনোবিজ্ঞান ব্যাপারে কী বলে”?

ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে হলে আরও অনেক বিষয় জানতে হবে। আপনি ছোটবেলা থেকে কীভাবে বড় হয়েছেন। স্ত্রীর সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল, স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষকদের সাথে আপনার সম্পর্কটা কেমন। আরও অনেক বিষয় থেকে একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব"

তাহলে কি আমি এখন চলে যাব”? “একটু বসুন। আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করব"

আপনার বাম হাতটা তো সব সময় অনুভব করেন না, তাই না?”

জি। মাঝে মাঝে করি"

আপনার বাম হাত এখন কাজ করছে বা কাজ করার জন্য প্রস্তুত, সেটা কীভাবে বুঝতে পারেন"

কাজের মাঝে কখন যে দুই হাতে কাজ করা শুরু করি নিজেও জানি না। আগে থেকে সেটা বুঝতে পারি না"

আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার সম্পর্কটা কেমন ছিল"? “আমি সব সময় নিজের মতোই থাকতাম। ওর সাথে তেমন কথাবার্তা হতো না

ঠিক আছে। আজ অনেক রাত হয়ে গেছে, আপনি চলে যান

"স্যার কি আমার ঘটনাটা বিশ্বাস করেননি, তাই না”! “আমি কোনো সিদ্ধান্তে আসার মতো তথ্য পাইনি। কাজেই কিছু বলতে পারছি না

 

গভীর রাত। গ্রামের পথ ধরে আজমল সাহেব বাড়িতে ফিরছেন। আনিস সাহেবের বন্ধু ইকবাল হোসেন তার ঘটনা বিশ্বাস করেননি। যখন কেউ তার ঘটনা শুনে গুরুত্ব না দেয় তখন তার খুব মেজাজ খারাপ হয়। তার স্ত্রীও তাই করেছিল। ঘটনা শুনে খুব ব্যঙ্গ করেছিল। ঘটনাটা বিশ্বাস না করলেও অন্তত গুরুত্ব দিয়ে শোনা উচিত। আজমল হোসেন গ্রামের নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। বাড়িতে আসতে হলে বাজারের ওপর দিয়ে আসতে হয়। আসার সময় বাজার করেছেন। তার এক হাতে বাজারের ব্যাগ আর অন্য হাতে ইলিশ মাছ

 

মাছ কেনার সময় মাছওয়ালা সেকেন্দার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মাস্টোর, তুমার তো বউ নাই, একটা হাতও নাই। তাইলে এত্ত বড় ইলিশ মাছ কি তুমি একাই খাইবা, তাছাড়া এক হাতে মাছ কাটা ক্যামনে”?

 

পরের দিন সকালে ইকবাল হোসেন গ্রাম দেখতে বের হয়েছিলেন। পথে এক মধ্যবয়স্ক মহিলার সাথে দেখা হয়ে গেল। মহিলার নাম আয়েশা, গায়ের রং শ্যামবর্ণ। বয়স চল্লিশের আশেপাশে হতে পারে। আজমল সাহেবের সাথে একই স্কুলে মাস্টারি করেন। আগের যুগে গ্রামের মহিলারা (শিক্ষিত বা অশিক্ষিত) অপরিচিত মানুষের দিকে দূর থেকে চেয়ে থাকত, এভাবে হাসি মুখে কথা বলত না। উনি আমার বন্ধু আনিসকে বেশ ভালো করেই চেনেন এবং ক্যানসার সম্পর্কেও বেশ ভালো জ্ঞান রাখেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে আজমল সাহেবের প্রসঙ্গ চলে এল। এবং বেশ চমকপ্রদ কিছু তথ্য পাওয়া গেল। মহিলাটি চলে যাওয়ার পর ইকবাল হোসেন একটি চায়ের দোকানে বসে পর পর দু'কাপ চা খেলেন। এর মাঝে তিনি ডায়েরিতে ক্রমিক নম্বর দিয়ে মহিলার কাছে থেকে পাওয়া আজমল সাহেব সম্পর্কে তথ্যগুলো লিখে ফেললেন।

 

. আজমল সাহেবের বিয়ে হয়েছিল প্রায় ১৫ বছর আগে। কিন্তু কোনো সন্তান নেই।

 

. আজমল সাহেব ছোট শিশুদের অনেক স্নেহ করেন। স্কুলের সব ছাত্র-ছাত্রীকে তিনি নিজের সন্তানের মতো দেখেন।

 

. ইনি একজন প্রেতসাধক। গ্রামের মানুষের মাঝে জীন-ভূত তাড়ানোর ব্যাপারে ওনার খুব নাম-ডাক না থাকলেও পরিচিতি আছে। . স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না। ঝগড়া-ঝাঁটি খুব একটা না হলেও কথাবার্তা নাকি খুব প্রয়োজন ছাড়া একে অপরের সাথে বলতেন না। ওনার স্ত্রীর শরীর-স্বাস্থ্য ভালো ছিল না। খুব রোগা এবং প্রায় সারা বছরই অসুখ

 

বিসুখ লেগে থাকত। আজমল সাহেবের স্ত্রীর গলায় বাম হাতের ছাপ পাওয়া গেছে এটা গ্রামের প্রায় সবাই জানে। এখন গ্রামের সবাই আজমল সাহেবকে বেশ সমীহ করে। সবাই জানে, ওনার স্ত্রীকে ওনার পোষা জিনরাই হত্যা করেছে। এখন অবশ্য ওনার জিন-ভূত তাড়ানোর ব্যবসাটা বেশ রমরমা হয়ে উঠবে। .

 

. শেষ তথ্যটি সবচেয়ে চমকপ্রদ। যেখানে সবকিছুতেই একটা কিন্তু চলে আসে। আজমল সাহেবের স্ত্রীর হত্যা মামলাটি নাকি থানায় হত্যা মামলা হিসেবে দেখানো হয়নি। আকস্মিক মৃত্যু হিসেবে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। কিন্তু কেন? যদি আকস্মিক মৃত্যু হয় তবে গলায় আঙুলের ছাপ এল কীভাবে? আর আঙুলের ছাপ আসার পরেও এটাকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলো কেন?

 

এর নিচে ইকবাল হোসেন নিজের মতামত দিয়ে রেখেছেন। মতামতটা একেবারে পূর্ণ সিদ্ধান্ত বলা যায় না।

 

আজমল সাহেবের কোনো ছেলেমেয়ে না থাকার কারণে ওনার নিজের মাঝে একটা তীব্র কষ্টের জন্ম হয়েছে। সেখান থেকে ওনার সাথে ওনার স্ত্রীর সম্পর্কে শীতলভাবের জন্ম। প্রেতসাধক সম্পর্কে তেমন তথ্য পাওয়া গেল না। আসলে আজমল সাহেব কোন পর্যায়ের প্রেতসাধক সেটা জানা দরকার। একটা হাত না থাকার কারণে ওনার অনেক কাজেই সমস্যা হচ্ছে। প্রেতসাধনাতেও বাধা পড়ছে। মনে হয় আজমল সাহেব নিজেই ওনার স্ত্রীকে হত্যা করেছেন। তবে সেটা অদৃশ্য বাম হাত দিয়ে নয়, ডান হাতেই হত্যা করেছেন। বাম হাতের গল্পটি অলৌকিক। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এই কথা তিনি সবাইকে বলে বেড়াচ্ছেন। স্ত্রীকে হত্যা করার ব্যাপারে উনি একটু কৌশল ব্যবহার করেছেন। সাধারণত কাউকে গলা টিপে হত্যা করা হলে তার বুকের ওপর বসে গলা টিপে ধরতে হবে। হাত দিয়ে গলা টিপে ধরলে সাধারণত গলায় হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপ পড়ে না। শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলি তর্জনীর ছাপ পড়ে। সে ক্ষেত্রে যদি কারো বুকের ওপর বসে, ডান হাত দিয়ে গলা টিপে হত্যা করলে, মৃত মানুষের গলার ডান দিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি গলার বাম দিকে তর্জনীর ছাপ পড়বে। কিন্তু আজমল সাহেবের স্ত্রীর ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টোটা। গলার বাম দিকে ছিল বৃদ্ধাঙ্গুলি গলার ডান দিকে তর্জনীর চিহ্ন ছিল। সে জন্য সবাই ভেবেছে এটা বাম হাতে কেউ হত্যা করেছে। আজমল সাহেব ওনার স্ত্রীর মাথার পেছন থেকে এসে যদি ডান হাত দিয়ে গলা টিপে ধরে তবে ব্যাপারটা হবে বাম হাতের মতো।

 

কিন্তু এভাবে গ্রামের সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো গেলেও পুলিশ এখনো নিশ্চুপ কেন সেটা পরিষ্কার না। ধরে নিলাম আজমল সাহেব ওনার স্ত্রীকে হত্যা করেননি, তাহলে অন্য কেউ করেছে! সেই ব্যক্তিকে পুলিশ খুঁজছে না কেন?

 

এই পর্যন্ত লিখে ইকবাল সাহেব আর লেখেননি। সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে ফেরার সময় ইকবাল সাহেব হঠাৎ আজমল সাহেবের বাড়িতে হাজির হলেন। আসার কোন প্ল্যান ছিল না। কেন যে চলে এলেন নিজেও ঠিক বুঝতে পারলেন না।

 

আজমল সাহেব আছেন নাকি”?

 


দরজা খুলে দিয়ে আজমল হোসেন তেমন চমকালেন না। যেন ইকবাল সাহেবের আসার ব্যাপারটা উনি জানতেন

 

আসুন স্যার, ভেতরে আসুন"

হঠাৎ করে চলে এলাম

জি ভালো করেছেন

এই সন্ধ্যাবেলা কী করছেন"?

সন্ধ্যা কই? এখন তো রাত। গ্রামে সাতটা বাজলেই রাত হয়ে যায়"

আপনি কি রান্না করছেন নাকি

জি, একা পইড়া গেছি। তাই রান্নাটা নিজেকেই করতে হচ্ছে

কী রান্না করছেন”?

ইলিশ মাছ। গতকাল আনছিলাম, লবণ-হলুদ দিয়া অর্ধেক মাছ জ্বাল দিয়া রাখছিলাম

এক হাতে রান্না করতে অসুবিধা হয় না”?

 

আজমল সাহেব এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। ইকবাল হোসেন সেটা বুঝতে পেরে দ্রুত অন্য প্রশ্নে চলে গেলেন

 

আপনি নাকি প্রেতসাধনা করেন”?

 

আজমল সাহেব আবারও কোনো জবাব দিলেন না। ইকবাল সাহেব বেশ ভড়কে গেলেন। এই প্রশ্নটা সম্ভবত আগেরটার চেয়ে বেশি বিব্রতকর ছিল। এবার ইকবাল সাহেব রান্নার প্রসঙ্গে চলে গেলেন-

 

বেশ ঘ্রাণ বের হয়েছে দেখছি। এত চমৎকার রান্না কে শেখাল”?

রান্না প্রায় শেষ, আর আমি রান্না করেই খেয়ে নিই। আপনি আজ আমার সাথে খান"

না না, ঠিক আছে। আমি এখনই চলে যাব"

চলে যাবেন কেন? খাওয়া-দাওয়া শেষে সারারাত গল্প করব। প্রেতসাধনার গল্প শুরু করলে সারারাত লাগবে। আর রাতের বেলা এসব গল্পের কোনো জুড়ি নেই। আপনি হাত-মুখ ধুয়ে নিন। গামছা নিয়ে কলের পাড়ে চলে যান

 

ইকবাল সাহেব কিছু বললেন না। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা রেখে গামছা হাতে কলের পাড়ে চলে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, কী করবেন? এখানে থাকবেন নাকি চলে যাবেন। শেষমেশ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তই নিলেন। কারণ ওনার কথাবার্তায় যদি ওনার স্ত্রীর হত্যার কোনো ক্লু পাওয়া যায় তবে পুলিশকে সাহায্য করা যাবে।

 

ইকবাল সাহেব হাত-মুখ ধুয়ে ঘরের ভেতর ঢুকলেন। খুব বেশিক্ষণ সময় নেননি। তবে এই সময়ের মধ্যে ডায়েরিতে লেখা আজকের তথ্যগুলো সব পড়ে ফেলা সম্ভব।

 

খেতে বসে ইকবাল সাহেব বেশ ভড়কে গেলেন। ইলিশ মাছের এমন চমৎকার রেসিপি উনি আগে কখনো খাননি। এটা কীভাবে রান্না করা হয়েছে জানতে চাইবেন, ঠিক তখনই আজমল সাহেব বললেন-

 

সামান্য বরইয়ের আচার দিয়েছি। কোনো পানি দিইনি। মসলার মাঝে ইলিশ মাছ কষাইছি

আপনি কীভাবে জানলেন, আমি রেসিপি জানতে চাচ্ছি”!

আপনিই তো বললেন, আমি প্রেতসাধনা করি। প্রেতসাধনার ফলে এই ক্ষমতা অর্জন করেছি

 

ইকবাল সাহেবের গলায় খাবার আটকে গেল। ওনার চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আজমল সাহেব কি আসলেই এমন ক্ষমতার অধিকারী?

 

স্যার কি আমার কথা শুনে ভয় পেয়েছেন? একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই অনেক কিছু জানা যায়। আপনি ভাত মুখে দিয়েই থেমে গিয়েছিলেন। আপনার চোখ চকচক করছিল এবং মুখটাও বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। এর অর্থ হচ্ছে, তরকারি আপনার অসম্ভব পছন্দ হয়েছে। এবং প্রায় সাথে সাথে প্রশ্ন করার ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়েছেন। সেজন্য আপনি কিছু বলার আগেই উত্তরটা দিয়েছি। এটা বোঝার জন্য প্রেতসাধক হতে হয় না বা শার্লক হোমসও হতে হয়। না। আমার কথা কি আপনার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে”?

 

জি হয়েছে। কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝতে পারলাম না। যে মানুষ এমন চমৎকার লৌকিক ব্যাখ্যা দিতে পারে, সেই মানুষ প্রেতসাধনার মতো অলৌকিক ব্যাপার নিয়ে সময় নষ্ট করে কেন”?

না জেনে মন্তব্য করা ঠিক নয়। আর যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের চোখে দেখবেন না, ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাসও করবেন না

আপনি কি আমাকে জিন-ভূত দেখাবেন নাকি”?

"না। আপনাকে কিছু তথ্য দিব। আমি ডান হাতে আমার স্ত্রীকে হত্যা করিনি। বাম হাতেই করেছি..... এই কথা বলতে বলতে আজমল সাহেব বাম হাতে গ্লাস ধরে পানি খেলেন।

 

ইকবাল সাহেব চমকে উঠলেন। অসম্ভব একটি দৃশ্য দেখলেন।

 

“... বাম হাত কীভাবে কাজ করছে আমি জানি না। হয়তো প্রেতসাধনার ফলে এই ক্ষমতা আমার মাঝে আপনাআপনি তৈরি হয়েছে। যখন বাম হাতে কিছু ধরার ইচ্ছা করি তখন ধরতে পারি। শুরুতে সমস্যা হচ্ছিল কিন্তু এখন ইচ্ছা করা মাত্রই এটা সম্ভব হচ্ছে। পুলিশ এসে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কারণ, আমার পাশে রাতে আমার স্ত্রী শুয়ে ঘুমাচ্ছিল, অথচ খুন হয়ে গেল! এটা গ্রামের মানুষকে উল্টাপাল্টা বোঝানো গেলেও থানার ওসিকে বোঝানো সম্ভব না। উনি আমাকে নিশ্চিত ফাঁসিতে ঝোলাতেন। কিন্তু আমার স্ত্রীর গলায় বাম হাতের চিহ্ন এবং আমার আছে শুধু ডান হাত। এটাই ওসি সাহেব মেলাতে পারছিলেন না।

 

আমি ওনাকে বললাম, আমাকে ছেড়ে দিতে এবং আমার স্ত্রীর মৃত্যুর সাধারণ ডায়েরি করতে। উনি আমার গালে কষে একটা চড় মারলেন। হঠাৎ আমার কী যেন হলো, আমিও সাথে সাথে ওসি সাহেবের গালে চড় বসিয়ে দিলাম। কিন্তু সেটা দিলাম বাম হাতে। ওসি সাহেব গালে হাত দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। চড় খাওয়ার জন্য নয়। অলৌকিক কিছু উপলব্ধি করার জন্য। আর কিছু বলতে হয়নি, ওসি সাহেব আমার স্ত্রীর মৃত্যুকে আকস্মিক মৃত্যু হিসেবে সাধারণ ডায়েরি করেন এবং আমাকে ছেড়ে দেন।

 

ওসি সাহেবের ভয় পাওয়াটা আমার জন্য অনেক বড় একটা পাওনা। কারণ, আমি এরপর আমার মাঝে অনেক কুচিন্তা ভর করেছে। সারাক্ষণ মনে হয়, এই ক্ষমতা দিয়ে আমি অনেক কিছু করতে পারি। সারাজীবন কষ্টে কেটেছে, বাকি জীবনটা অনেক শান্তিতে কাটাতে পারব। আর সেজন্য এই গ্রামে থাকলে আমার চলবে না। আমাকে শহরে যেতে হবে। ঢাকা শহরে। আমি কখনো ঢাকায় যাইনি। আপনাকে দেখে হঠাৎ আমার মনে হলো, আমার ঘটনা শোনার পর ঢাকা শহরের একজন শিক্ষিত বুদ্ধিমান মানুষের কী প্রতিক্রিয়া হয় সেটা যাচাই করি। অভিজ্ঞতা সুখের নয়। আপনি প্রথমত আমার কোনো কথাই বিশ্বাস করেননি। দ্বিতীয়ত আপনি সবকিছু ঘোলা করার পায়তারা করছেন।

 

ঘোলা করার পাঁয়তারা করছি মানে"?

পুলিশ কেন এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সাধারণ ডায়েরি করল....

“...এটা আপনি জানলেন কীভাবে”?

আপনার ডায়েরি পড়তে বেশিক্ষণ সময় লাগার কথা নাআপনি আমার ডায়েরি পড়েছেন? আমি আর এখানে থাকব না, আমি উঠলাম। এই ব্যাপারে আর আপনার সাথে কোনো কথাই বলব না

যে মানুষ অদৃশ্য বাম হাতে সবকিছু স্পর্শ করতে পারে, তাকে আপনার এতটা অবহেলা করা উচিত না। ওসি সাহেব আমাকে দেবতার মতো মান্য করেন। ওনাকে আমার অনেক প্রয়োজন পড়বে। সে জন্য এখনো ওনাকে জীবিত রেখেছি"

 

ইকবাল সাহেব কিছু বললেন না। দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে ছুটে চললেন।

 

আজমল সাহেব হাসছেন। হাসতে হাসতে মোবাইল ফোন বের করে থানার ওসি সাহেকে ফোন করলেন- “ওসি সাহেব, কেমন আছেন? মাঝরাতে একটু ডিস্টার্ব করলাম। একটা জিডি করতে হবে। একজন মানুষ রাস্তায় মরে পড়ে আছে। খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছে কিন্তু কেসটা অন্য কিছু বানাতে হবে...

………………………………………………………………………………………………

কোন মন্তব্য নেই

Popular Posts

Featured Post

টাইটানিক কি সত্যিই ডুবেছিলো!

  টাইটানিকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান White Star Line ১৯০৭ সালে ৩টি বিলাশবহুল সুপার লাইনার তৈরীর পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ...

Blogger দ্বারা পরিচালিত.