"সময় নিয়ন্ত্রক" (ফিরোজ হাসান)
What মানে কি? এই ধরনের প্রশ্ন কেউ করলে মাথা সাধারণত বিগড়ে
যাওয়ার কথা। ফরহাদের হয়েছে সেই অবস্থা। তার বাসায় গোবেচারা টাইপ যে কাজের ছেলেটা
আছে,
নাম
আব্দুল;
সে খুব
আগ্রহ নিয়ে ফরহাদকে জিজ্ঞেস করেছে-
- ভাইজান, এই টাইম মেশিনডার নাম কি?
প্রশ্ন করে সে খুব আগ্রহ নিয়ে তার ভাইজানের
উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। ফরহাদের নিজেকে ধাতস্থ করতে বেশ বেগ পেতে হলো।
দীর্ঘ তিন বছর পর আজ তার টাইম মেশিন তৈরীর কাজটা শেষ হয়েছে। এই তিন বছর আব্দুল তার
ভাইজানকে টাইম মেশিন নামের কিছু একটা তৈরী করতে দেখেছে। কিন্তু কোন দিন সে তার
ভাইজানকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। আজ ফরহাদকে উল্লাস করতে দেখে এই প্রশ্নটা করেছে।
ফরহাদ এবার আব্দুলকে টাইম মেশিন সম্পর্কে জ্ঞান দিতে শুরু করলো। ফরহাদ যতটা
সিরিয়াস হয়ে কথা বলছে আব্দুল তারচেয়েও বেশী সিরিয়াস হয়ে শুনছে।
- শোন আব্দুল। এই যন্ত্রটির নাম-ই টাইম মেশিন।
- এইডা দিয়া কি টাইম দেখা যায়! তাইলে তো এইডা একটা ঘড়ি।
- আরে না। এইটা দিয়ে টাইম ভ্রমন করা যায়।
- আপনার কথা কিছুই বুঝলামনা।
- তুই যেমন ঢাকা থেকে সিলেট, চট্টগ্রাম, বগুড়ায় বেড়াতে যাস
তেমনি এই টাইম মেশিনের সাহায্যে তুই ইচ্ছা করলে ১০ বছর সামনে বা ১০ বছর পিছনে যেতে
পারবি।
- বুঝলামনা, মানে ১০ মাইল সামনে বা
১০ মাইল পিছনে...
- মাইল নয় বোকা, বছর। অর্থাৎ তুই ইচ্ছা
করলে সময় ঘুড়ে আসতে পারবি। ৩০০ বছর পিছনে গিয়ে দেখে এলি কিভাবে ইংরেজরা আমাদের উপর
রাজত্ব করেছে। অথবা ৪০০০/৫০০০ বছর আগে গিয়ে দেখে
এলি মিশরে কিভাবে পিরামিড তৈরী হয়েছিলো।
“তুমি কিভাবে এই টাইম মেশিনটা তৈরী করেছো আমি
সেটা দেখতে চাই”- কথাটি শুনে ফরহাদ আব্দুলকে জিজ্ঞেস করলো-
- কিরে আব্দুল ! তোর আওয়াজ
মেয়েদের মতো হলো কিভাবে?
- আমার আওয়াজ ঠিকই আছে ভাইজান। আপনার পিছনে
দেখেন।
ফরহাদ পিছনে চেয়ে দেখে অগ্নিমূর্তির মতো
মিথিলা দাঁড়িয়ে আছে।
- গত তিনদিন তোমার মোবাইল অফ। দেখা পর্যন্ত করনি, কেন?
মিথিলার দাঁত চিবানো প্রশ্ন শুনে ফরহাদ আমতা
আমতা করতে থাকে।
- ভাইজান, টাইম মেশিনডা কি ইস্টাট দিমু?
পালানোর জন্য এরচেয়ে কোন ভালো উপায় নেই মনে
করে আব্দুল তার ভাইজানের অনুমতি চায়। কিন্তু মিথিলার ধমক খেয়ে আব্দুল চুপসে গেলো।
- তুমি বলো, কি সমস্যা তোমার?
- না মানে... ইয়ে... এতদিন ব্যস্ত ছিলাম, তবে টাইম মেশিনের কাজ
একেবারে শেষ।
- তুমি তোমার টাইম মেশিন নিয়ে জাহান্নাম ভ্রমন
করো।
ঝড়ের গতিতে বের হয়ে গেল মিথিলা। তার গন্তব্যের
দিকে চেয়ে আছে ফরহাদ। আব্দুল কাছে এসে বললো - ভাইজান, বিয়াডা কইরা ফেলেন।
তারপর এই মেশিনডাত চইরা দুইজনে হানিমুন করতে যাবেন। ফরহাদ হানিমুন সংক্রান্ত কিছু
একটা বলতে চাচ্ছিলো, কিন্তু সে প্রসংঙ্গ পাল্টে বললো-
- শোন আব্দুল। আমি হানিমুন ট্রাভেল এজেন্সির
জন্য টাইম মেশিন তৈরী করিনি। তবে তোর আইডিয়াটা খারাপ না। পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো
হানিমুন ট্রাভেল হিসেবে সময় ভ্রমণ করা।
- ভাইজান, আপনি নিজে একবার টেরাই কইরা দ্যাখেন।
- আমি নিজে ‘টেরাই’ করতে পারবোনা।
- ক্যান্ পারবেননা, পোবলেম কোতায়?
- ‘পোবলেম’ হচ্ছে, অনুমতি দরকার। অনুমতি ছাড়া
আমার গাড়ি ‘ইস্টাট’ দিবেনা।
- অনুমতি! ক্যাডায় অনুমতি দিবো?
- জানিনা।
ফরহাদ আর কোন কথা না বাড়িয়ে ঘরে চলে যায়।
আব্দুল গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবতে থাকে।
প্রায় একমাস হয়ে গেলো ফরহাদের কম্পিউটার
মনিটরে কোন সিগনাল আসছেনা। এরমধ্যে মিথিলা জানিয়ে দিয়েছে, যদি আগামী এক মাসের
মধ্যে ফরহাদ বিয়ে করতে পারে তাহলে তার বাবা রাজি আছেন, নইলে তিনি তার বন্ধুর
ছেলের সাথে মিথিলার বিয়ে ঠিক করেছেন এবং এরপর মিথিলাও তার বাবাকে আর অনুরোধ
করবেনা। কিন্তু ফরহাদ একমাস কেন, একদিনের নোটিশেও বিয়ে করতে পারবে, যদি তার কম্পিউটার
মনিটরে কোন সিগনাল আসে।
এমনই এক রাতে কম্পিউটার চালু করে টাইম মেশিনে
বসে ফরহাদ কাজ করছে। পাশের ঘরে আব্দুল ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎ মনিটরে অদ্ভুত একটি আলোর
রেখা দেখা যায়। ফরহাদ চমকে ওঠে। সাথে সাথে হেড ফোন কানে লাগিয়ে স্পিকার অন করে
দেয়।
“আপনি কি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছেন”? ভরাট কন্ঠের কেউ যেন ফরহাদকে জিজ্ঞেস করলো।
“হ্যা পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি”। উত্তেজিত
হয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জাবাব দেয় ফরহাদ।
- আমাদের সাথে সময় পরিভ্রমণ করতে চান?
- হ্যা চাই, অবশ্যই চাই। আপনারা
বাংলায় কথা বলেন?
- অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন পরে শুনবো। এখন ঠিক করে বলো, তুমি কি সত্যিই অতীত
ভবিষ্যৎ দেখতে চাও?
- একবারতো বললাম চাই। আমাকে কি করতে হবে তাই
বলুন...
- আমাদের হাতে সময় খুব কম। আবারও ভেবে দেখো, যাবে কিনা? পরবর্তী পরিস্থিতির
জন্য...
- আমি যেকোন পরিস্থিতির জন্য রাজি আছি।
- ঠিক আছে। তুমি তাহলে চোখ বন্ধ করে বসে থাকো।
আমরা তোমাকে এখন স্থির সময়ে নিয়ে যাবো।
- স্থির সময়ে কেন? অতীত ভবিষ্যৎ...
- অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন পরে শুনবো।
- ঠিক আছে। প্রয়োজনীয় কাজ করেন।
ফরহাদ চুপ করে বসে আছে। খুব মৃদু শব্দে টাইম
মেশিনটি চালু হয়ে গেলো। চারিদিকে হলুদ আলোয় সবকিছু ঢেকে যাচ্ছে। একসময় গাঢ় হলুদ
আলো ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে। এরপর টাইম মেশিনটির সেই মৃদু শব্দ থেমে গেলো। আর
এরসাথে চারিদিকের হলুদ আলোর জায়গায় নিকষ অন্ধকার এসে জমা হলো। চারিদিকে অসহ্যকর
অন্ধকার। “ফরহাদ”, কেউ একজন কথা বললো-
- স্থির সময়ে তোমাকে স্বাগতম।
- এখানে সময় সত্যি সত্যি চিরকাল স্থির থাকবে?
- স্থির সময়ে একাল, ওকাল, চিরকাল, সকাল, বিকাল কোনকিছুই নেই।
- তাহলে এখন কি আমি আমার ‘অপ্রয়োজনীয়’ প্রশ্নগুলো করবো?
- ঠিক আছে করো।
- আপনারা বাংলায় কথা বলেন?
- না। আমাদের ফ্রিকোয়েন্সি সিস্টেম পৃথিবীর
অক্ষাংশ,
দ্রাঘিমাংশ, রেডিও শব্দ তরঙ্গ, মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদির
উপর নির্ভরশীল। তুমি যদি তোমার এই প্রোজেক্ট চীন দেশে বসে করতে, তবে আমাদের সিগনাল
তোমার কাছে শোনাতো চাইনিজ ভাষার মতো।
- দ্বিতীয় প্রশ্নটি হচ্ছে, আমার অতীত ভবিষ্যৎ
পরিভ্রমণ করার কথা। কিন্তু এই স্থির সময়ে আমাকে কেন আনা হলো? চারিদিকে ভয়ংকর
অন্ধকার।
- কোথাও যাত্রা করার জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে
যেতে হয়। যেমন: ট্রেন ভ্রমণের জন্য স্টেশন, বাস ভ্রমণের জন্য
টার্মিনাল, প্লেন ভ্রমনের জন্য এয়ারপোর্ট। ঠিক তেমনি সময় পরিভ্রমণের
জন্য প্রথমে স্থির সময়ে আসতে হয়।
- এবার বলুন আপনাদের আমি কি বলবো?
- আমরা সময় নিয়ন্ত্রক।
- সময়কে নিয়ন্ত্রণের ‘চাকরি’ কত দিন হলো করছেন?
- তোমার এই প্রশ্নের উত্তর পরে দিবো। এখন বলো
কোন সময়ে যেতে চাও তুমি?
- মিথিলার সাথে আমার বিয়ে নিয়ে বেশ এপার-ওপার অবস্থা চলছে। মানে ৫০/৫০
সম্ভাবনা। তাই আমি দেখতে চাই আমাদের বিয়েটা আসালেই হবে কিনা।
- দুঃখিত ফরহাদ। তুমি ভবিষ্যৎ দেখতে পারবেনা।
- কেন? ভবিষ্যৎ আবার কি দোষ করলো?
- তুমি যদি ভবিষ্যৎ ভ্রমণ করো, তবে আর কখনো বর্তমানে
ফিরে যেতে পারবেনা।
- এটা আবার কেমন কথা?
- বোকার মতো কথা বললে। অবশ্য তোমাকে দোষ দিয়ে
লাভ নেই। কারণ, প্রথম প্রথম অনেক বিজ্ঞানী মনে করতেন সময় পরিভ্রমণ করা বুঝি
খুবই সহজ কাজ। কোন ভাবে যদি একটা টাইম মেশিন তৈরী করা যায় তাহলে যেকোন সময় হতে
ঘুরে আসা যাবে। তখন অনেকেই প্রশ্ন করলো, যেমন: তুমি এখন প্রায় ৩০/৩২ বছরের যুবক। এখন তুমি যদি টাইম মেশিনে চড়ে ২০ বছর অতীতে
যেয়ে কিশোর ফরহাদকে হত্যা করো, তাহলে তোমার বর্তমান অস্তিত্ত্বের কি হবে? ১০ বছরের ফরহার যদি
মারা যায়,
তবে ৩০
বছরের যুবক ফরহাদ এলো কোথা’ থেকে? তখন আবার সেই
বিজ্ঞানীরাই আবার বললেন, সময় পরিভ্রসণ করা সম্ভব, তবে সুদূর অতীত থেকে
ঘুরে আসা যাবে। যেখানে মানুষ তার কোন পূর্ব পুরুষকে খুঁজেই পাবেনা। কিন্তু...
- কিন্তু কি?
- সমস্যার কোন সমাধান কিন্তু হলো না। যদি কেউ
সময় পরিভ্রমণ করে নিজের পূর্ব পুরুষকে খুঁজে না পায় তাতে কি সব সমাধান হয়ে গেলো! আমরা পৃথিবীর অনেক বড় বড় ইতিহাস জানি। যেমন: তুমি অতীতে গিয়ে মীর জাফরকে হত্যা করলে এবং লর্ড ক্লাইভের
সাথে যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলা জয়ী হয় তাহলে কি হবে তুমি বুঝতে পারছো!
- তাহলে কি সময় পরিভ্রমণ ব্যাপারটা মিথ্যা?
- মিথ্যা নয়। কিভাবে এবং কোন শর্ত মেনে প্রকৃতি
মানুষকে সময় পরিভ্রমণ করায়, এটা তোমাকে সরাসরি না দেখালে তুমি বুঝবে না।
কথাবার্তা এখন বন্ধ থাক। চলো, তোমাকে অতীতে নিয়ে যাই। অতীত ভ্রমণে কোন
সমস্যা নেই। তুমি চাইলেই পাঁচ ঘন্টা অতীতে যেতে পারবে, আবার পাঁচশ বছর অতীতেও
যেতে পাবরে। আশা করছি অতীতে গেলেই সময় পরিভ্রমণ সম্পর্কে তোমার যাবতীয়
চিন্তাভাবনাই পাল্টে যাবে।
টাইম মেশিনটি আবার চালু হয়ে গেছে, ফরহাদ শুনতে পেলো
মেশিনের খুব মৃদু শব্দ। এরপর চারিদিকের অন্ধকারের মাঝে আস্তে আস্তে হালকা একটা
হলুদ আলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে। সেই আলো একসময় গাঢ় হলুদ রং-এ পরিণত
হলো। চারিদিকে সেই গাঢ় হলুদ আলো ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। এমন সময় ফরহাদ
লক্ষ্য করলো, হলুদ আলো ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। কিছু একটা দেখা
যাচ্ছে। গাছ, নদী, পাখি, আকাশ সবকিছু স্পষ্ট হতে থাকে। মানুষজন যাচ্ছে-আসছে। ফরহাদ জিজ্ঞেস করলো, “হ্যালো সময় নিয়ন্ত্রক, আপনি কি আমার সাথে আছেন”?
- হ্যা আছি। কি দেখতে পাচ্ছো সব কিছু?
- পাচ্ছি। আচ্ছা, এটা কোন জায়গা?
- কোন জায়গা মানে? তোমার ঘর, যেখানে বসে তুমি আমাদের
সাথে যোগাযোগ করেছিলে। তবে এটা বর্তমান সময় হতে ৩০০ বছর পূর্বে।
- আমি আপনাদের একথা কেন বিশ্বাস করবো? এটাতো মিথ্যাও হতে
পারে।
- তাহলে এককাজ করো। কোন একজন মানুষের সাথে কথা
বলার চেষ্টা করো। তাকে বলো যে, তুমি ভবিষ্যৎ থেকে এসেছো। অথবা গাছের একটা
পাতা ছিড়ে হাতে নাও।
- এসব করে কি হবে?
- তা’হলেই তুমি বুঝতে পারবে
যে,
তুমি
বর্তামানে আছো, নাকি অতীতে।
- ঠিক আছে করছি। এ আর এমন কি কাজ!
ফরহাদ গত এক ঘন্টা ধরে অশেপাশের সব মানুষের
সাথেই কথা বলার চেষ্টা করলো। কিন্তু কেউ তার কথা শুনতে পারছে না। শুধু তাই নয়, সে যে একজন জলজ্যান্ত
মানুষ রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে, এটাই কোন মানুষ দেখতে পারছেনা। ফরহাদ অতীতের
কোন কিছুতেই স্পর্শ করতে পারছে না। অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে বললো,
- নাহ্! পারলামনা, কেউ আমার কথা শুনতে
পাচ্ছে না কেন?
- তোমার কি মনে হয়, প্রকৃতি এত সহজেই তার
নিয়মকে ভাঙতে দিবে?
- বুঝলামনা। আমি আবার প্রকৃতির কি করলাম?
- মনে করো তুমি একটা জমিতে ফসল করতে চাচ্ছো।
কিন্তু তোমার সেই জমির আশেপাশে সব সময় গরু-ছাগল ঘুড়ে বেড়ায়। তাহলে
তুমি কি করবে?
- অবশ্যই ফসল করার আগে জমিতে বেড়া দিবো, যেন গরু-ছাগল জমির কোন ক্ষতি না করে।
- ভেরি গুড। এখন মনে করো, জমিটা হচ্ছে অতীত-ভবিষ্যৎ। প্রকৃতি হচ্ছে জমির মালিক। জমির ফসল হচ্ছে অতীত-ভবিষ্যতের ঘটনা। আর তুমি হচ্ছো গরু-ছাগল।
- আমি গরু-ছাগল!
- অবশ্যই। মানুষ এসে অতীতকে বদলাবে, এতে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ
হবে। আর প্রকৃতি সেটা সহ্য করবে?
- তাহলে অতীতে এসে আমাদের কি লাভ?
- সব সময় লাভ লোকসান খোঁজ কেন? তুমি এখন তোমার চারপাশে
যা দেখছো এটাকে মনে করো একটি Holographic 3D Video clips। প্রকৃতি তোমাকে সেই অতীতের ঘটনাটা দেখাচ্ছে। মানুষ সবসময়
অতীতের ঘটনাকে খুঁজে বেড়ায়। যেমন: পিরামিডের রহস্য অথবা
ডাইনোসরের বিলুপ্তির কারণ ইত্যাদি। সেই অতীতকে জানার সহজ উপায় হচ্ছে টাইম মেশিন।
ব্যস্ এই পর্যন্ত। এরচেয়ে বেশী আর কি আশা করো? তুমি সবসময় গরু-ছাগলের মতো জমির ক্ষতি করবে আর প্রকৃতি বারবার সেটা মেরামত
করবে?
পৃথিবীতে
যা একবার ঘটে গেছে তা আর বদলানো সম্ভব নয়। শুধু জানতে পারবে।
- তাহলে ভবিষ্যৎ পরিভ্রমণ করাটা...
- কথায় আছে বাঙালীকে বসতে দিলে শুতে চায়।
ভবিষ্যৎ পরিভ্রমণ করতেওতো একই সমস্যা। মনে করো তুমি তোমার সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে
পাঁচতলা একটা বিল্ডিং বানাবে এবং শেষ জীবনে বসে বসে আরামে খাবে। এটা তোমার
পরিকল্পনা। কিন্তু বিল্ডিং বানানোর পর ভূমিকম্পে তোমার বিল্ডিং ভেঙে যাবে আর তোমার
শেষ জীবন হবে খুব দুর্বিসহ। প্রকৃতি তোমার জন্য এমন ব্যবস্থাই করে রেখেছে। এখন
তুমি যদি ভবিষ্যৎ পরিভ্রমণ করে তোমার বিল্ডিং বানানোর প্ল্যানটা চেঞ্জ করো তাহলে
প্রকৃতির নিয়ম পাল্টে যাবে।
- তারমানে প্রকৃতির জমি খুবই সুরক্ষিত। গরু-ছাগল কিছুই করতে পারবেনা।
- ঠিক তাই। তবে তুমি যদি কোনভাবে একবার ভবিষ্যৎ
দেখে ফেলো তাহলে আর কখনোই বর্তমান সময়ে ফিরে আসতে পারবেনা।
- আমার ভবিষ্যৎ দেখার কোন দরকার নেই। আমি এখন
বর্তমান সময়ে ফিরে যাবো।
- তুমিতো বর্তমান সময়েই আছো।
- তারমানে? আপনিতো তখন বললেন এটা স্থির সময়।
- হ্যা, ঠিকই বলেছি। বর্তমান সময়টা চলমান সময়। কিন্তু
যখন কেউ সময় পরিভ্রমণ করে তখন চলমান সময়টা স্থির হয়ে যায়। কারণ, তুমি অতীত পরিভ্রমণ
করছো আর চলমান সময়ে তোমার কোন অস্তিত্ত্ব নেই। এটা একটা অদ্ভুদ ব্যাপার না?
- বুঝতে পেরেছি। অর্থাৎ আমি বর্তমান সময়ে চলমান
হলে পৃথিবীর সবকিছু চলতে শুরু করবে। নইলে আব্দুল অনন্তকাল ধরে ঘুমাবে।
- হাঃ হাঃ হাঃ। ঠিক বুঝতে পেরেছো। তবে মূল
সমস্যাটা এখন তোমাকে বলি...
- মূল সমস্যা?
- হ্যা। তোমার বর্তমান সময়ে উপস্থিত হওয়া এবং
স্থির সময়কে চলমান করার মাঝে যদি...
- কি হলো, বলুন কি সমস্যা?
- এর মাঝে যদি এক পিকো সেকেন্ডও এদিক ওদিক হয়, তাহলে তুমি আর কখনো
বর্তমান সময়ে ফিরে যেতে পারবেনা।
- ও মাই গড্।
- এই তথ্য শোনার পর ২২৩ জন মানুষই ‘ও মাই গড্’ শব্দটি উচ্চারণ করেছে।
- ২২৩ জন মানুষ মানে?
- সময় পরিভ্রমণে তুমি ২২৪ তম যাত্রী। তবে এই
পিকো সেকেন্ডের কাজটা মাত্র ২১ জন মানুষের ক্ষেত্রে সফল ভাবে সম্পন্ন করা গেছে।
- মানে, মাত্র ২১ জন মানুষ ফিরে যেতে পেরেছে?
- হ্যা।
- তাহলে বাকি ২০২ জন মানুষ এখন কোথায়?
- ২০১ জন মানুষ ভবিষ্যৎ দেখে বেড়াচ্ছে।
- আর বাকি একজন?
- আমিতো তোমার সাথেই আছি।
- আপনি... আপনি সাধারণ একজন
মানুষ।
- হ্যা। তোমার মতোই সাধারণ একজন মানুষ। আমার নাম
জাহিদ।
- আপনি এখানে কি করছেন?
- তোমার মতো আমিও এসেছিলাম পরিভ্রমণ করতে।
কিন্তু ফিরতে পারিনি।
- তাহলে আপনাকে আমি দেখতে পাচ্ছিনা কেন?
- ঐ যে বললাম, এক পিকো সেকেন্ড এদিক
ওদিক হলে তুমি আর কখনো বর্তমান সময়ে ফিরতে পারবেনা, তখন তুমি আমাকে দেখতে
পারবে।
- আপনি আমাকে তথ্য দিচ্ছে, নাকি ভয় দেখাচ্ছেন?
- ভয়ংকর তথ্য দিচ্ছি।
- আমার আর আপনার সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে না।
আমি ফিরে যেতে চাই।
- বেশ। তাহলে প্রস্তুত হও। তোমার টাইম মেশিন
চালু করো।
- করেছি।
- এখন যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে, তোমার এবং আমার টাইম
মেশিনের বাটন এক সাথে টিপতে হবে। এখানে যদি এক পিকো সেকেন্ডও এদিক ওদিক হয় তাহলে...
দুজনেই নিশ্চুপ। টাইম মেশিনের মৃদু শব্দের সাথে চারিদিকে অন্ধকার ভেদ করে হলুদ আলো ছড়িয়ে পড়ছে। একসময় গাঢ় হলুদ আলো ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে। এরপর টাইম মেশিনটির ছোট্ট স্ক্রিনে সেকেন্ড কাউন্ট ডাউন হতে শুরু করলো। ২০ ১৯ ১৮... জাহিদ আবারো ফরহাদকে মনে করিয়ে দিলো-
- তোমার মনে আছে তো! জিরো
হওয়ার সাথে সাথে ‘এন্টার’ বাটন চাপ দিবে।
- ঠিক আছে।
তারপরেও ফরহাদেও হাত পা কাঁপছে। যদি ফিরে যেতে
না পারে। যদি... ফরহাদ আর কিছু ভাবতে চাচ্ছেনা। সে এক দৃষ্টিতে
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনে সময় কমছে ...৪ ৩ ২ ১ ০। ফরহাদ
সঙ্গে সঙ্গে এন্টার বাটন চাপ দিলো। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো
হলুদ আলো ভেদ করে তার নিজ ঘরের চলমান সময়ে উপস্থিত হতে। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পর
আবার সেই হলুদ আলো আস্তে আস্তে কালো অন্ধকারে ঢেকে গেলো। এরপর অসহ্যকর নিস্তব্ধতায়
নিঃসঙ্গ ফরহাদ চিৎকার করতে লাগলো, “জাহিদ, আপনি কি আমার আশে পাশে আছেন”? কোন উত্তর পেলোনা ফরহাদ। এই প্রথম অন্ধকার ভেদ করে বিন্দুর
মতো একটি আলোর উপস্থিতি লক্ষ্য করলো ফরহাদ। সেই আলোর বিন্দুটি আস্তে আস্তে বড় হতে
লাগলো। ফরহাদ দেখলো, কেউ একজন এগিয়ে আসছে। হ্যা, আলোর মতো উজ্জ্বল পোষাক
পড়ে একজন মানুষ এসে তার সামনে দাঁড়ালো। ফরহাদের বুঝতে কোন অসুবিধা হলো না, লোকটি জাহিদ।
- আপনি জাহিদ। তাই না?
জাহিদ নাড়লো, “তোমাকে স্বাগতম জানাবো
নাকি তোমার জন্য দুঃখ প্রকাশ করবো, বুঝতে পারছিনা”।
- যা হওয়ার ছিলো হয়েছে। আমি মন খারাপ করছিনা।
- এখন তোমার মন খারপ হচ্ছে না। কিন্তু একসময়
ঠিকই হবে,
তখন তোমার
কষ্টের চিৎকার শুধু তোমার কানেই ফিরে আসবে। আর কেউ শুনবে না।
- এখন আমি কি করবো?
- জানিনা। ইচ্ছা করলে অতীত-ভবিষ্যৎ
দেখতে পারো। সবাইতো তাই করছে।
- সবাই মানে?
- তখন তোমাকে বললাম, ২০১ জন মানুষ...
- ও হ্যা। আচ্ছা, আপনি ভবিষ্যৎ দেখেন না?
- না। আমি প্রায় ১০৮ বছর ধরে এই ‘চাকরি’ করি। তখন তোমার এই
প্রশ্নে উত্তর দেয়ার সময় ছিলোনা, তাই দিইনি। বলতে পারো আমি সময় পরিভ্রমণকারীদের
ট্যুরিষ্ট গাইড। শুধু অতীত ঘুরে দেখাতে পারি।
- ১০৮ বছর মানে বুঝলামনা। আপনার বয়স কত?
- ১৩৮ বছর। এখানে সময় স্থির। তাই আমার বয়স, বার্ধক্য, ক্ষুধা সবকিছুই স্থির।
- তারমানে, এভাবে অনন্তকাল ধরে...
- ঠিক ধরেছো। আমার জন্ম ২০১৯ সালে। আমার বয়স যখন
৪৩ বছর,
অর্থাৎ
২০৬২ সালে আমি সময় পরিভ্রমণ করি। তখন থেকে
আজ ২১৫৭ সাল
পর্যন্ত আমি এখানে আছি।
- আমি আর কিছুই ভাবতে পাছিনা। আচ্ছা, আপনার সময় কাটে কিভাবে?
- সময়তো স্থির।
- মানে, আপনি এখানে একা একা কি করেন?
- অপেক্ষা করি। চলমান সময় হতে আসা মানুষদের জন্য
অপেক্ষা করি।
- আচ্ছা, ২০১ জন মানুষ কে কোথায় আছে?
- জানিনা। একেকজন একেক সময়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে
বেশীর ভাগ মানুষ ভবিষ্যতেই আছে। বর্তমান সময় হতে এক সেকেন্ড ভবিষ্যতে গেলেই তোমার
সাথে আমার আর যোগাযোগ হবেনা।
- কেন?
- কেন আবার? প্রকৃতির নিয়মে।
প্রকৃতি কোনভাবেই ভবিষ্যৎ আর বর্তমানের মাঝে সংযোগ হতে দিবেনা।
- আমি ভবিষ্যৎ দেখতে চাই।
- ঠিক আছে যাও। তোমার সাথে দেখা হয়ে ভাল লাগলো।
ফরহাদ টাইম মেশিন চালু করলো। এখন ২১৫৭ সাল, সে টাইম সেটিং ঘরে
লিখলো ২১৬০ সাল। তবে এন্টার বাটন চাপ দেবার আগে জাহিদকে সে জিজ্ঞেস করলো-
- আপনি এমন উজ্জ্বল পোষাক কোথায় পেয়েছেন?
- এই উজ্জ্বল পোষাকই আমার টাইম মেশিন। তবে তোমার
এই তেলের ড্রামের মতো দেখতে টাইম মেশিনের চেয়ে অনেক ভালো।
বিদায় জানিয়ে ফরহাদ এন্টার বাটনে চাপ দিয়ে
ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। কালো অন্ধকার ভেদ করে সবকিছু উজ্জ্বল হতে শুরু
করেছে। তারপর খেয়াল করলো সে তার ঘরেই আছে। দেয়ালে ক্যালেন্ডার ঝোলানো, তাতে স্পষ্ট দেখা
যাচ্ছে ২১৬০ সাল। অর্থাৎ সে দুইবছর ভবিষ্যতে চলে এসেছে। আব্দুল বিয়ে করে দিব্বি
তার বাসাতেই আছে। ফরহাদ চিৎকার দিয়ে উঠলো, কিন্তু তার উপস্থিতি বা আওয়াজ কেউ শুনতে
পেলোনা। তখন তার জাহিদের কথা মনে হলো। সে বলেছিলো চারপাশের সবকিছুই Holographic
3D Video, শুধু দেখা যাবে। সে তখন মিথিলার বাসায় গেলো। মিথিলার বিয়ে
হয়ে গেছে। তার বাবার বন্ধুর ছেলে আরমান ও মিথিলা একটি ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে বেশ সুখেই
আছে। ফরহাদ তাদের পাশে বসে আছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। তারা দু’জনেই তাদের মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছে। মিথিলা বলছে মেয়ে
ডাক্তার হবে আর আরমান বলছে ইঞ্জিনিয়ার হবে। তাদের কথা বার্তা শুনতে ফরহাদের বেশ
লাগছিলো। এমন সময় তার মনে পড়লো টাইম মেশিনের কথা-
- আরে, আমিতো ইচ্ছা করলেই দেখতে পারবো মিথিলার মেয়েটি
বড় হয়ে কি হবে।
এবার ফরহাদ আনুমানিক এক সময়ে মিথিলাদের
পরিবারকে দেখার জন্য ২১৯০ সাল লিখে এন্টার চাপলো। কিন্তু এখানে এসে সে কাউকে খুঁজে
পেলোনা। ফরহাদ বেশ অবাক হলো। সে ২১৮৬ সালে গেল, এখানেও কেউ নেই। তাহলে
সবাই গেল কৈ? ফরহাদ বর্তমান সময়ে ফিরে এলো। ২১৫৭ সাল। মিথিলার বিয়ে
হচ্ছে। কিন্তু সে কারো সাথেই যোগাযোগ করতে পারছেনা। আবার সে ভবিষ্যতে গেল। এবার সে
২১৮০ সালে পৌছালো। কিন্তু না, এখানেও নেই। এরপর ২১৭৫, ২১৭০, ২১৬৮ সাল কোথাও মিথিলা
ও তার মেয়ে, স্বামী কাউকেই ফরহাদ খুজে না পেয়ে অস্থির হয়ে বসে আছে। তখন
খুব কাছে থেকে কে যেন ধমক দেবার মতো করে বললো- “এই ছাগলটা আবার কে”? ফরহাদ পিছন ফিরে দেখে
বয়ষ্ক রোগা একজন লোক তার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। তাই দেখে ফরহাদ লাফ দিয়ে
উঠলো-
- আপনি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন?
- কেন পারবোনা? আমি কি তোমার মতো ছাগল
নাকি,
তা এখানে
তুমি কি করছো?
- আপনি কে?
- আমি সবচেয়ে বড় রাম ছাগল, প্রথম সময়
পরিভ্রমণকারী। আমার নাম শওকত।
- তোমার সমস্যা কি?
- আমি একজনকে খুঁজছি। কিন্তু কোথাও খুঁজে
পাচ্ছিনা।
- বর্তমান সময়েও নেই। মানে ২১৫৭ সালে।
- তা আছে। কিন্তু ভবিষ্যতের কোথাও খুঁজে
পাচ্ছিনা কেন?
- ওর বায়োডাটা বলো।
- তাহলে কি হবে?
- তুমিতো দেখছি আমার চেয়েও বড় রাম ছাগল। তোমাকে
কি জাহিদ আমার সম্পর্কে কিছুই বলেনি?
- না।
- তাহলে শোন। সময় পরিভ্রমণে প্রাইম সংখ্যার একটা
বিশেষ গুরুত্ব আছে। যে ২১ জন ফিরে গেছে তাদের প্রত্যেকের জন্ম তারিখ একটা প্রাইম
সংখ্যা। আর আমার জন্ম তারিখটা ছিলো ২৯.০২.২০১২। এর মানে
দুইটা হতে পারে। খুব ভালো অথবা খুব খারাপ। ২৯ একটা প্রাইম সংখ্যা কিন্তু ফেব্রুয়ারী
মাসের এই ২৯ তারিখ চার বছর পর পর আসে। তাই এটি একটি বিশেষ প্রাইম জন্ম তারিখ।
যাইহোক,
ভবিষ্যতে
একবার এলে কাউকে আর টাইম মেশিন সাথে রাখার কোন প্রয়োজন হয়না। কারণ সে তখন নিজের
ইচ্ছা শক্তি দিয়ে সময় পরিভ্রমণ করতে পারবে। আবার ইচ্ছা করলে একজন মানুষের জন্ম
থেকে মৃত্যুকাল পর্যন্ত পুরোটাই খুব কম সময়ে ঘুড়ে আসতে পারবে। তবে এই কাজটা রপ্ত
করতে অনেক দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তাই বলছিলাম মেয়েটির বায়োডাটা দাও আমি দেখে আসছি।
ফরহাদ আর কোন কথা না বলে শওকতকে মিথিলার
বায়োডাটা বললো। শওকত তাকে এখানেই অপেক্ষা করতে বলে চলে গেলো। বেশ অনেক্ষণ পর আবার
ফিরে এলা শওকত। তার মুখটা বেশ বিমর্ষ দেখাচ্ছে, কাছে আসতেই ফরহাদ
জিজ্ঞেস করলো-
- কি দেখে এলেন? মিথিলা কোথায় আছে?
- তুমি কি সত্যিই জানতে চাও?
- অবশ্যই জানতে চাই।
- তাহলে তোমাকে নির্দিষ্ট সময়ে যেতে হবে। ২১৬৩
সালের জুন মাসের ১৮ তারিখ রাত ১টা ২৮ মিনিট।
- ঠিক আছে। আমি গেলাম।
ফরহাদ চলে গেল সেই নির্দিষ্ট সময়ে। মিথিলা, আরমান ও তাদের মেয়ে কোন
এক বিয়ের পার্টি শেষে গাড়িতে ওঠে। এরপর গাড়ি চলতে শুরু করে। একটা দূরে যেতেই ভয়ানক
একটা এক্সিডেন্ট ঘটে। সেখানে গিয়ে ফরহাদ দেখে তিনজনই মারা গেছে। শওকত পাশে এসে
দাঁড়ায়। ফরহাদ অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেনা।
- কি ভাবছো তুমি?
- আমি এখন কি করবো?
- তুমি কি করবে মানে?
- ওদেরকে বাঁচাবো কিভাবে?
- আমরা এখন শুধুই দর্শক। কিছুই করার নেই।
- আপনি কিছু ব্যাবস্থা করতে পারেননা?
- না। আমি সাধারণ শওকত। প্রকৃতি না।
- তারপরেও আমি ওদের বাঁচাবো।
- কিভাবে বাঁচাবে?
- জানিনা।
- ঠিক আছে। তুমি চেষ্টা করো। আমি চললাম।
ফরহাদ এখনও জানেনা সে কিভাবে তাদের বাঁচাবে।
এভাবে অপেক্ষা আর বৃথা চেষ্টা করে দীর্ঘ তিন বছর পার হয়ে গেলো। আজ বর্তমান সময়
অনুযায়ী ২১৬৩ সালের জুন মাসের ১৮ তারিখ রাত ১টা বাজে। বিয়ের পার্টিতে মিথিলা, আরমান ও তার মেয়ে বেশ
হাসি খুশিই দেখাচ্ছে। ফরহাদ মিথিলার পাশে দাড়িয়ে বারবার বলছে,“এখনই বের হও তোমরা।
দেড়ী করলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তোমরা সবাই মারা যাবে”। তার এই
চিৎকার বৃথা, একথা জানার পরেও ফরহাদ মিথিলার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকছে।
দূর্ঘটনার কথা বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা। রাত ১টা ২৩ মিনিটে
পার্টি শেষে মিথিলা, আরমান ও তাদের মেয়ে গাড়িতে ওঠে। গাড়ির জানালার পাশে দাঁড়িয়ে
ফরহাদ চিৎকার করে বলছে,“তোমরা এখন যেয়োনা। সবাই মারা যাবে। প্লিজ আমার কথা শোন”। আরমান গাড়ি
স্টার্ট দিবে তখন মিথিলা গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে এদিক ওদিক তাকায়। আরমান
জিজ্ঞেস করে-
- কি হয়েছে মিথিলা?
- নাহ, কিছু হয়নি।
- তাহলে বাইরে কি দেখছো?
- না মানে... আমার কেন জানি মনে হলো কে যেন যেতে নিষেধ করলো।
- তাই নাকি! কিন্তু
আশেপাশে কেউ নেইতো।
- গলার আওয়াজ অনেকটা ফরহাদের মতো।
- কোন ফরহাদ, তোমার ঐ পাগল বিজ্ঞানী? হাঃ হাঃ হাঃ।
মিথিলা আর কোন কথা বললোনা। আরমান গাড়ি ষ্টার্ট দিলো। ফরহাদ দেখলো, তার সামনে থেকে মিথিলাদের গাড়ি চলে যাচ্ছে। দূরে অনেক দূরে। আকাশ ভর্তি চাঁদের আলো। মাঝে মাঝে রাতের পাখিরা ডাকছে। ফরহাদ একা একা রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে। তার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। হঠাৎ তার জাহিদের কথা মনে পড়লো। জাহিদ তাকে একবার বলেছিলো-“ নিজের কষ্টের চিৎকার শুধু নিজের কানেই ফিরে আসবে। আর কেউ শুনবে না ”।
.............................................................................................................



কোন মন্তব্য নেই