বাঙালীর রুচির দূর্ভিক্ষ কিভাবে হলো?
এদেশের মানুষের যদি সত্যিই রুচির দূর্ভিক্ষ থাকে, তাহলে শাহরুখের পাঠান মুভি এদেশের সিনেমা হলে মুক্তি দিতে এত আপত্তি ছিলো কেন? রুচির দূর্ভিক্ষ দর্শকের না, দূর্ভিক্ষ এদেশের সিনেমা নাটকের ডিরেক্টরদের। কলকাতায় হিন্দি মুভি চলে৷ কিন্তু তারা ভয় করে না যে, বলিউডের মুভি চললে তাদের মুভির বাজার নষ্ট হবে। তাদের মুভির ১টা লেভেল আছে। সেই লেভেল বলিউড, হলিউড নষ্ট করতে পারবে না।আর এই দেশের ডিরেক্টর, আর্ষ্টিস্টদের একটা সময় লেভেল ছিলো। সংশপ্তক এর মত নাটক হয়েছে, "তিতাস ১টি নদীর নাম" এই দেশের মুভি। একসময় শাবানা, ববিতা বলিউডের সাথে যৌথ নির্মিত মুভির লিড অভিনেত্রী হিসেবে মুভি করেছে। সেই বাজার কারা নষ্ট করেছে?
সালমান শাহ পরবর্তী যুগে মুভিতে নোংরা কাটপিস দেখানো হতো। তখন রুচিশীল দর্শক বাংলা সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। একটা সময় নাটকে সুবর্ণা মুস্তফা, ফেরদৌসী মজুমদার, হুমায়ূন ফরিদীর মত দূর্দান্ত শিল্পীরা কাজ করতো। তখন যে কেউ চাইলেই নাটকে অভিনয় করতে পারতো না। কিন্তু গত দুই যুগ ধরে নাটকের যে প্যাটার্ণ তৈরী হয়েছে তাতে স্ক্রিপ্ট লাগে না, রিহার্সেল লাগে না, যে কেউ যে কোনও উচ্চারণে ডায়লগ বলে অভিনয় করলেই হলো! এতে দর্শক বাড়লেও তাতে রুচির দূর্ভিক্ষ টাইপ দর্শকই বেশি। এখন চাইলেই মানুষ হলিউড, বলিউড, স্প্যানিশ, ইরানী, তুর্কি, কোরিয়ান সব ক্লাসিক মুভি দেখতে পারছে। সেখানে বাংলাদেশের বস্তা পঁচা নাটক সিনেমা কে দেখে? যেমন ডিরেক্টর, তেমন নাটক সিনেমা, তেমন তার অডিয়েন্স।
একটা সময় সাউথ ইন্ডিয়ান মুভি কে দেখতো? ২০ বছর আগেও তাদের মার্কেট আমাদের মতোই ছিলো৷ আজ তারা কোন পর্যায়ে গেছে? কিভাবে গেলো? তারা কি দর্শকদের সুরুচির ভ্যাকসিন দিয়েছে? না, তারা নতুন নতুন কনসেপ্ট এনেছে, মানুষ সেটা গ্রহণ করেছে। ১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায় যখন পথের পাঁচালী নির্মান করলো, তখন বঙ্গ ভূমিতে সেই ছবি কেউ দেখেনি। পশ্চিমারা যখন পথের পাঁচালী দেখে প্রশংসা করলো, তখন বাঙালীরা বুঝতে পারলো, এই মুভি তাদের লেভেলের চেয়ে উপরের মুভি। পথের পাঁচালী দর্শকদের টেনে উপরের লেভেলে নিয়ে গেছে।
আর আমাদের দেশের নির্মাতারা নিজেরা গল্প লিখবে, নিজেরা নির্মান করবে৷ বাহিরের গল্প নিতে চায় না। নিজেদের বস্তাপঁচা গল্প নির্মান করবে আর আপনি (as a writer) যত ভালো গল্প নিয়ে যান, ডিরেক্টররা আপনার গল্প "পাবলিক খাবে না" বলে রিজেক্ট করবে। সংশপ্তক নাটকে হুমায়ূন ফরিদীর অভিনয় দেখে এদেশের "রুচির দূর্ভিক্ষ" টাইপ নির্মাতারা বুঝতে পারলো না যে ফরিদী দূর্দান্ত অভিনেতা, তারা বুঝলো ফরিদী ভালো একজন ভিলেন। তাকে বাংলা ছবির ভিলেন বানালো হলো। এটাই এইদেশের নির্মাতাদের রুচির দূর্ভিক্ষের নমুনা। অথচ বলিউডে পরেশ রাওয়াল চলচ্চিত্রে ভিলেন হিসেবে অভিনয় শুরু করলেও একসময় নির্মাতারা তার প্রতিভা ধরতে পেরেছে। বাকিটা ইতিহাস! তো এটাই বলিউডের নির্মাতাদের সুরুচির পরিচয়।
অনেকে সিনেমা নির্মানের সীমাবদ্ধতা, বাজেট স্বল্পতার কথা বলবে৷ তাদের বলবো, ইরানী মুভি & তুর্কি মুভির সীমাবদ্ধতা আমাদের চেয়েও বেশি। তারপরেও তারা Children of heaven, Mucize এর মত মাস্টার পিস মুভি বানায়। আমি ব্যক্তিগত ভাবে এইদেশের নিম্নমানের নাটক, সিনেমা avoid করি৷ যাদের বিশ্বমানের অভিয়েন্স তৈরী হয় না, সিনেমা হল বন্ধ হয়, তাদের নিয়ে যারা পজেটিভ চিন্তা করে তাদেরকেও আমি avoid করি। তবে "হাওয়া" এর মত দারুন মুভি আমি একাধিকবার দেখি।
আমি কলকাতার মুভি দেখি, সাউথ ইন্ডিয়ান মুভি দেখি। স্প্যানিশ, টার্কিশ, ইরানী, সাউথ কোরিয়ান মুভির দর্শক। আমার প্রিয় ডিরেক্টর ক্রিস্টোফার নোলান, জেমস ক্যামেরন, মাজিদ মাজিদী, রাজকুমার হিরানী, সংকর, রাজামৌলি, কৌশিক গাঙ্গুলি, সৃজিৎ মুখার্জি। এদেশের হাজার হাজার মানুষ আছে যারা বিশ্ব চলচিত্রের দর্শক। এইদেশের সস্তা নাটক সিনেমা নিয়ে তারা ভাবে না। তবে হঠাৎ কিছু ভালো মুভি তৈরী হলে সেটার দর্শক ঠিকই চলে আসে। হিরো আলম এক শ্রেনীর অডিয়েন্সের জন্য ভিডিও বানায়, তেমনই এদেশের অধিকাংশ নির্মাতা টাকা কামানোর উদ্দেশে "কিছু একটা" বানায়৷ তারাই এদেশের মার্কেট নষ্ট করেছে। তাদের নিয়েতো মামুনুর রশিদ কখনও কিছু বলেনা! এক হিরো আলম যদি তার নিম্নমানের ভিডিও দিয়ে বাংলাদেশের নাটক সিনেমার প্রতি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বুঝুন এদেশের নাটক সিনেমার কতটা দূরাবস্থা!!



কোন মন্তব্য নেই