Header Ads

যে ভুলে পরাজিত হিটলার!

হিটলার চেয়েছিলেন নিজ হাতে নতুন বিশ্ব ইতিহাস লিখতে। লিখে ফেলেছিলেনও প্রায়। কিন্তু মারাত্মক ভুল করে ফেললেন তার দুটি চালে। প্রথমটা ফ্রান্স দখলের পর হিটলার ইংল্যান্ড দখলের গড়িমসি করে আর দ্বিতীয়টা ভুল সময়ে রাশিয়া আক্রমণ করে।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী তখন উইন্সটন চার্চিল। চার্চিল ছিল ঝানু রাজনীতিবিদ। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি প্রমাণ রাখলেন তিনি শুধু রাজনীতিবিদই নন একজন সফল কূটনীতিবিদও বটে। ব্রিটেনের সামনে  রাস্তা খোলা ছিল একটাই। যদি নতুন মহাশক্তি আমেরিকা তাঁদের পাশে দাঁড়ায়।

প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল যোগাযোগ করলেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট এর সাথে। রুজভেল্ট ছিলেন সুযোগের অপেক্ষায়। তিনি তাঁর মত করে পরিকল্পনা করে ফেললেন। এবার সুযোগটা ঠিকমত কাজে লাগাতে হবে। তৈরি হবে নতুন ইতিহাস।

রুজভেল্ট চার্চিলের সাথে মিলিত হলেন আটলান্টিক মহাসাগরে। তারা  ভাসছিলেন ব্রিটেনের রণতরী ‘প্রিন্সেস অফ ওয়েলস’ এ।  তিনদিন আলোচনা করলেন তাঁরা। রুজভেল্ট চার্চিলকে জানালেন তাঁর প্রস্তাব। আমেরিকা তার সর্বোচ্চ  দিয়ে ব্রিটেনকে বাঁচাবে। শর্ত একটাই, যুদ্ধ শেষ হলে সারা পৃথিবীতে ব্রিটেনের অধীনে যত ভূখণ্ড আছে, সেখানে স্বাধিকার দিতে হবে। মানে হল, ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর মানুষ স্বাধিকার পাবে। তাঁরা নিজেরা চাইলে ব্রিটেনের অধীনে থাকবে, না চাইলে স্বাধীন হয়ে যাবে।

চার্চিল কিন্তু নিরুপায়। যদিও ইচ্ছা করলে তিনি এই প্রস্তাব নাও  মানতে পারেন। জাহাজের উপর দাঁড়িয়ে তিনি চারদিক তাকালেন। তারপর গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন। তার মনে হল, হিটলার আসছেন লন্ডনের দিকে। রুজভেল্টের কথা না শুনলে তাঁর গোটা সাম্রাজ্যই চলে যাবে জার্মানির হাতে। অন্যদিকে, রুজভেল্টের  কথা শুনলে যুদ্ধ শেষে স্বাধীন হয়ে যাবে ব্রিটিশ উপনিবেশ একে একে। ব্রিটেনের মুকুট থেকে ধীরে ধীরে খসে পড়বে একটি একটি পালক। চার্চিল আবার ভাবলেন,  এই প্রস্তাব মানলে ব্রিটেনের মানুষ আমাকে ছাড়বে না। কিন্তু যুদ্ধটা ব্রিটেন জিতে যাবে। চার্চিল ভাবলেন, আমি আর প্রধানমন্ত্রী হতে পারব না। আর হয়েছেও তাই। পরের নির্বাচনে তিনি হেরেছিলেন।

আটলান্টিকের বুকে দাঁড়িয়ে চার্চিলকে মানতে হল রুজভেল্টের কথা। স্বাক্ষর হল চুক্তি, আটলান্টিক চার্টার - That Treaty is known as The Lend Lease Agreement of 1941 - USA and UK;. এটা ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ। নিশ্চিত হয়ে গেল, যুদ্ধ শেষে ব্রিটেন একে একে হারাবে তাঁদের সকল উপনিবেশ। যে সাগরপথ ব্রিটেন আটকে রেখেছে, সেগুলো খুলে দিতে হবে সবার জন্য। অনেক নতুন স্বাধীন দেশ গঠন হবে। সেখানে সস্তায় পাওয়া যাবে অনেক কাঁচামাল। যেই বাজারগুলো উপনিবেশের বাঁধনে দখল করে রেখেছে ব্রিটিশরা, সেগুলো হবে উন্মুক্ত। আর যুদ্ধ শেষে একমাত্র বড় শক্তি হবে আমেরিকা। আর ধীরে ধীরে এসব বাজার আসবে আমেরিকার হাতে। নিশ্চিত হল, যুদ্ধ শেষে যে দিন আসবে, সেই দিন  আমেরিকার দিন হবে।

শুরু হল আলোচনা ১৯৪৪ সালে। এবার আমেরিকার মাটিতে। নিউ হ্যাম্পসায়ারের ব্রেটন উডসে। মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলে। ততদিনে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার রূপরেখা অনেকটাই হয়ে গেছে। টানা বাইশ দিন আলাপ চলল ব্রেটন উডসে। জন্ম হল তিনটি প্রতিষ্ঠানের, বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা। পৃথিবী পেল এক নতুন মহাজনী কারবার।

১৯৪৫ সাল; শেষ হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সেইসাথে চুপ হয়ে গেল পশ্চিমা রণাঙ্গন। সারা ইউরোপজুড়ে  ধ্বংসলীলা। সফলভাবে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের কারণে একক সম্রাট বনে যায় ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা। যুদ্ধ চলাকালীন মারা যায় প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট; যার পরিকল্পনা কাজ করেছে চমৎকারভাবে। চুক্তি অনুযায়ী যুদ্ধ শেষেই পৃথিবীজুড়ে স্বাধীন হতে থাকল ইউরোপীয় উপনিবেশগুলো। এই নতুন দেশগুলো ভীষণ গরীব। আবার ইউরোপও বিধ্বস্ত। এই দেশগুলোকে বাঁচাতে আমেরিকার নেতৃত্বে এগিয়ে আসলো আইএমএফ আর বিশ্বব্যাংক।

আইএমএফ আর বিশ্বব্যাংক শুধু ঋণই দেয় না। ঋণের সাথে-সাথে দেয় একটা উন্নয়ণ পরিকল্পনাও। তার প্রতি ছত্রে লেখা দাতাগোষ্ঠীর অলঙ্ঘনীয় পরামর্শ। এইঅলঙ্ঘনীয় পরামর্শ সকল দেশের জন্য প্রায় একই রকম। তাদের মূল কথা - ‘সরকার হচ্ছে দেশের জন্য বোঝা, তাই সরকারের হাত যতটা পারো ছেঁটে দাও। সবকিছু প্রাইভেট করে দাও। সব উন্মুক্ত করে দাও।’

কিন্তু চাইলেই তো আর  প্রাইভেট কোম্পানি পাওয়া যায় না। দেশ হতদরিদ্র। অত প্রাইভেট কোম্পানি কই।  দেশে বড় প্রাইভেট কোম্পানি নেই, তো কী হয়েছে? ধনী দেশগুলোতে তো আছে! মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। তাঁরা যাবে। খালি হাতে যাবে না, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাবে। সেই বিলিয়ন ডলার দিয়ে অনেক বড় বড় অফিস হবে। ব্যবসা আসবে। লক্ষ লক্ষ লোকের চাকুরি হবে। তাঁদের অনেক ভাল বেতন হবে। ভাল বেতন হলে সঞ্চয় বেশি হবে। সরকারের ট্যাক্স বেশি আদায় হবে। সরকারও ধনী হবে। এবং হতেই থাকবে। তবে এই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি টাকা-পয়সা ঢালবে, তাদের দিকটাও কিন্তু দেখতে হবে। এরা যেন উপকার করতে গিয়ে কোন সমস্যায় না পড়ে। আর এইজন্য তোমাদের দেশের আইন-কানুন একটু রদবদল করতে হবে।  এইসব মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি যদি ভুল করেও কোন ভুল করে ফেলে, তাদের বিচার কিন্তু করবে দাতাগোষ্ঠী। এই শর্ত মেনেই এগুতে হবে। এরপর স্বচ্ছতার জন্য পরামর্শক নিয়োগ হবে। তারা পরামর্শ দিবে, দেখবে সবকিছু ঠিক আছে কিনা।  অনেক বড় বড় পণ্ডিত  তারা। এই পরামর্শদাতাদের বেতন-বোনাস একটু বেশিই হবে।

বড় বড় পণ্ডিতরা সব পরামর্শ দেবে।  যে যেই কাজ সবচেয়ে ভাল করতে পারে, শুধু সেই সেই কাজটা  করতে পারবে। যেমন, গমের দাম যদি বেশি হয় আর অন্য দেশে কম। তারমানে অন্যরা তোমাদের থেকে  গম  উৎপাদনে ভাল। তাই তারা আর গম জন্মাবে না। কম দামে গম কিনবে ওদের থেকে।

এভাবে একের পর এক শর্তে এক একটা গরীব দেশকে বেঁধে ফেলে এই দাতাগোষ্ঠীরা। তাদের এইসব চাতুরী বেশিরভাগ দেশ বোঝে না প্রথমে। যখন বুঝতে পারে, তখন আম-ছালা  দুইই  গেছে বিদেশী কোম্পানির হাতে।  ততদিনে ছোট ছোট শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। বাজার ভরে গেছে বড় বড় কোম্পানির বিদেশী পণ্যে। ঋণ তো শোধ হয়ইনি, উল্টো বেড়েছে।

এই দাতাগোষ্ঠীদের কোন বিকল্প নাই। এদের রয়েছে বিশ্বজুড়ে সিন্ডিকেট। এরা খুশি না হলে অন্যকেউ ঋণ দেবে না। কোন দেশও না, কোন আঞ্চলিক ব্যাংকও না। তাদের সমর্থন ছাড়া কোন বড় কোম্পানিও  দাঁড়াবে না পাশে। এই একই নাটক চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর থেকেই। এ যেন ধ্রুপদের চক্রবুহ্য; কেউ পারবেনা ভেদ করতে।

কোন মন্তব্য নেই

Popular Posts

Featured Post

টাইটানিক কি সত্যিই ডুবেছিলো!

  টাইটানিকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান White Star Line ১৯০৭ সালে ৩টি বিলাশবহুল সুপার লাইনার তৈরীর পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ...

Blogger দ্বারা পরিচালিত.